‘নামাজ পড়লে নম্বর কাটা’ নিয়ে বিভ্রান্তি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ

প্রকাশ: সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৯ অপরাহ্ণ
‘নামাজ পড়লে নম্বর কাটা’ নিয়ে বিভ্রান্তি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ

মাসুম বিল্লাহ (বাগেরহাট): বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার শিরিন হক পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায়ের ‘নামাজ পড়লে ১০ নম্বর কেটে নেওয়া হবে’—এমন বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ ঘটনায় প্রধান শিক্ষকের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সহকারী প্রধান শিক্ষক। তাঁদের দাবি, প্রধান শিক্ষক মূলত ‘নামাজ না পড়লে’ পরীক্ষায় ১০ নম্বর কেটে নেওয়ার কথা বলেছিলেন; কিন্তু বক্তব্যের একটি অংশ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কেটে ছড়িয়ে দেওয়ায় এ বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে রোববার (১১ অক্টোবর) এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংবাদমাধ্যমের ভুল তথ্য প্রচারের প্রতিবাদে এবং সঠিক তথ্য তুলে ধরার দাবিতে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছে। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষকও বক্তব্য দেওয়ার সময় অসাবধানতাবশত ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ার কথা স্বীকার করে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম বলেন, “আমি এই বিদ্যালয়ের একজন মুসলিম শিক্ষক। প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও বিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে মুসলিম ধর্মের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা দেখেছি। তিনি মুসলিম ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করেন এবং ছাত্রীদের নিয়মিত নামাজ পড়তে উৎসাহ দেন। সম্প্রতি তিনি নিজ খরচে ছাত্রীদের নামাজের জন্য একটি কক্ষের ব্যবস্থা করে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকার জায়নামাজ কিনে দিয়েছেন। কোনো ছাত্রী নামাজ না পড়লে পরীক্ষায় ১০ নম্বর কেটে নেওয়া হবে—তিনি এটিই বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু কিছু সংবাদমাধ্যম কী কারণে খণ্ডিত বক্তব্য প্রচার করলো তা বোধগম্য নয়। আমরা সঠিক তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।”

পুরোনো কাগজপত্র বিক্রি সংক্রান্ত অভিযোগ প্রসঙ্গে শিক্ষক সেলিম আরও জানান, চার-পাঁচ বছরের পুরোনো পরীক্ষার খাতা, নোট ও গাইডের কোনো কার্যকারিতা না থাকায় অফিস স্থানান্তরের সময় কমিটির অনুমোদন ও রেজুলেশন অনুযায়ী ৬০০ কেজি পুরোনো খাতা ও বই ১০ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। সেই টাকা প্রধান শিক্ষক নিজে নেননি; ঈদে মিলাদুন্নবী অনুষ্ঠানের আয়োজক কমিটির মাধ্যমে তা ব্যয় করা হয়েছে এবং সেখানে বোর্ডের কোনো পাঠ্যবই বিক্রি করা হয়নি।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নীলা, নবম শ্রেণির তাবাসসুম ও আয়েশা তাহাসিন পুথি জানায়, প্রধান শিক্ষক সর্বদাই তাদের নামাজ পড়ার বিষয়ে উৎসাহিত করেন। তারা বলে, “স্যার আমাদের নামাজ আদায়ের জন্য সুন্দর কক্ষ ও জায়নামাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। স্যার মূলত নামাজ না পড়লে ১০ নম্বর কাটার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ভিডিওর মূল অংশ থেকে ‘না’ শব্দটি বাদ দিয়ে প্রচার করায় স্যারের সম্মান ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।”

বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষিকা শারমিন খাতুন ও সহকারী শিক্ষক আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী জানান, প্রধান শিক্ষক কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ করেন না। ঈদে মিলাদুন্নবীর অনুষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষককে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন, ছাত্রীরা যেন ঠিকমতো নামাজ পড়ে এবং না পড়লে পরীক্ষায় ১০ নম্বর যেন কম দেওয়া হয়। পুরো বক্তব্য প্রচার না করে খণ্ডিত অংশ প্রচার করায় এমন ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে, যা বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে।

ঘটনার বিষয়ে প্রধান শিক্ষক সমর কৃষ্ণ রায় বলেন, “আমি হিন্দু ধর্মাবলম্বী হলেও মুসলিম ছাত্রীদের নামাজের জন্য আলাদা কক্ষ তৈরি করে প্রায় ২২ হাজার টাকার জায়নামাজ কিনে দিয়েছি। নামাজ না পড়লে ১০ নম্বর কেটে নেওয়ার কথা বলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত ‘না’ শব্দটি বাদ পড়ে যায়। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। কাউকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না।” তিনি আরও জানান, পুরোনো খাতা বিক্রির ১০ হাজার ৫০০ টাকাসহ অন্যান্য সহযোগিতায় মোট ৪৬ হাজার ৭০০ টাকা ব্যয়ে ঈদে মিলাদুন্নবী উদ্‌যাপন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ রোকনুজ জামান বলেন, “আমি পুরো বক্তব্যটি দেখেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রধান শিক্ষক অসাবধানতাবশত কথাটি বলে ফেলেছেন এবং পরে তিনি ভুল বুঝতে পেরে সবার কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন। সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ; তাই কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে সত্যতা সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার আহ্বান জানাচ্ছি।”

এআইএল/সকালবেলা