অনক আলী হোসেন শাহিদী: বাংলাদেশের কৃষি খাতের বর্তমান রূপান্তর প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) একটি কার্যকর রাষ্ট্রায়ত্ত অবকাঠামোগত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে, যেখানে উৎপাদন, উপকরণ সরবরাহ এবং সেচ ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। এই প্রেক্ষাপটে চেয়ারম্যান মোঃ আজিজুল ইসলামের নেতৃত্বকে শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি নীতিনির্ধারণী ও বাস্তবায়নমুখী রূপান্তরের অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বিএডিসির কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বীজ ব্যবস্থাপনাকে একটি কৌশলগত উৎপাদন উপাদান হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। উচ্চ ফলনশীল (HYV) বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ এবং কৃষকের কাছে সরবরাহ—এই চারটি ধাপকে একীভূত করে একটি ভ্যালু চেইন তৈরি করা হয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বীজের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং সময়োপযোগী বিতরণ নিশ্চিত করা। কৃষি উৎপাদনের স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে এই সরবরাহ শৃঙ্খলের দক্ষতার উপর। ফলে বিএডিসির বীজ কার্যক্রমকে শুধুমাত্র একটি উৎপাদন উদ্যোগ নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তিগত অবকাঠামো হিসেবে দেখা যায়।
সার ব্যবস্থাপনায় বিএডিসির ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়—সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামের ওঠানামা এবং আমদানিনির্ভরতা থাকা সত্ত্বেও দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই বলে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত একটি সমন্বিত লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বিতরণ—এই চারটি স্তরে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া এমন স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব নয়। এখানে চেয়ারম্যানের ভূমিকা হচ্ছে নীতিগত সমন্বয় এবং তদারকি নিশ্চিত করা, যাতে কোনো স্তরে বিঘ্ন না ঘটে। এর মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা কমে আসে, যা সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সেচ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিএডিসির কার্যক্রম একটি বৃহত্তর জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ভূগর্ভস্থ পানির উপর অতিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি একটি বিকল্প ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার পথ নির্দেশ করে। তারেক রহমান-এর ঘোষিত ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচির মধ্যে বিএডিসির ৯ হাজার কিলোমিটার বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ একটি বড় প্রশাসনিক ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ।
এই প্রকল্পের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি শুধুমাত্র সেচ সুবিধা বৃদ্ধি নয়; বরং একটি বহুমাত্রিক প্রভাব সৃষ্টি করবে। প্রথমত, বর্ষার পানি সংরক্ষণ এবং শুকনো মৌসুমে তা ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, জলাবদ্ধতা হ্রাস পাবে, যা কৃষি জমির ব্যবহারযোগ্যতা বাড়াবে। তৃতীয়ত, ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমবে, যা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক। ইতোমধ্যে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে ৬ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ এই বৃহৎ পরিকল্পনার একটি প্রাথমিক বাস্তবায়ন ধাপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোঃ আজিজুল ইসলাম প্রকল্পভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। প্রকল্প পরিচালকদের সাথে সরাসরি সভা করে সততা ও স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়া একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশের সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিন ধরে যে অনিয়ম ও বিলম্বের অভিযোগ রয়েছে, তা নিরসনে এই ধরনের কঠোর অবস্থান একটি ইতিবাচক সংকেত প্রদান করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে “গভর্নেন্স” বা সু শাসনের প্রশ্ন। উন্নয়ন প্রকল্পের সফলতা শুধু অর্থ বরাদ্দ বা পরিকল্পনার উপর নির্ভর করে না; বরং এর বাস্তবায়ন কাঠামো কতটা কার্যকর এবং জবাবদিহিমূলক তার উপর নির্ভর করে। চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণ এই কাঠামোকে শক্তিশালী করতে পারে।
বিএডিসিকে একটি “ইন্টিগ্রেটেড এগ্রিকালচারাল ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউশন” হিসেবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, এটি কৃষির তিনটি মূল উপাদান—বীজ, সার এবং পানি—এই তিন ক্ষেত্রেই সরাসরি ভূমিকা রাখছে। এই তিনটি উপাদানের সমন্বয় ছাড়া কৃষি উৎপাদনে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ফলে বিএডিসির কার্যক্রমকে খণ্ডিতভাবে নয়, বরং একটি সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
চেয়ারম্যান মোঃ আজিজুল ইসলামের নেতৃত্বে এই সমন্বিত কাঠামোকে কার্যকর করার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি এবং মাঠপর্যায়ে এর কার্যকারিতার উপর। বিশেষ করে খাল খনন কর্মসূচির মতো বৃহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, স্থানীয় অংশগ্রহণ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এ.আই.এল/সকালবেলা