মার্কিন বাহিনীর সামনে কতটুকু টিকবে আইআরজিসি? যা বলছে ইতিহাস

খামেনির মৃত্যু ও ব্যাপক বোমাবর্ষণের পরও আত্মসমর্পণ নয়, শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়বে ইরানের এই ‘ডিপ স্টেট’

মার্কিন বাহিনীর সামনে কতটুকু টিকবে আইআরজিসি? যা বলছে ইতিহাস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যে এক অদম্য ও প্রায়শই অবমূল্যায়িত শক্তি হিসেবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার সদস্য এবং আধাসামরিক বাহিনী 'বাসিজ'-এর আনুমানিক সাড়ে ৪ লাখ রিজার্ভ সদস্য নিয়ে গঠিত এই বাহিনী দেশটির রাজনীতি, গোয়েন্দা সংস্থা ও অর্থনীতির সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে।

​গত ২৮ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আইআরজিসিকে দায়মুক্তির বিনিময়ে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানান। তবে আইআরজিসি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। গত এক মাসে শীর্ষ অনেক নেতা নিহত হলেও এবং মার্কিন-ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও আইআরজিসি পিছু হটার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-এর এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ইতিহাস ঘাঁটলে বোঝা যায় কেন তারা যেকোনো স্থল আগ্রাসনকে অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রতিরোধ করবে।

মিলিশিয়া থেকে সম্মুখ সারির বাহিনী

১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময় আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির দর্শনে বিশ্বাসী ছাত্রদের নিয়ে গঠিত একটি স্ট্রিট মিলিশিয়া হিসেবে আইআরজিসির আত্মপ্রকাশ ঘটে। এরপর ১৯৮০ সালে ইরাকের ইরান আক্রমণের সময় তারা জাতীয় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি একটি সম্মুখ সারির যুদ্ধ বাহিনী হিসেবে আবির্ভূত হয়। পশ্চিমা বিশ্ব নীরব থাকার সুযোগে ইরাক তাদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করলেও তারা সাদ্দাম হোসেনের আক্রমণ প্রতিহত করে। এছাড়া ১৯৮০-র দশকে কুর্দি বিদ্রোহ থেকে শুরু করে ২০০০-এর দশকে বালুচ বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। ফলে, কুর্দি বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার ট্রাম্পের সাম্প্রতিক প্রচেষ্টা আইআরজিসি কমান্ডারদের প্রচণ্ড ক্রোধের মুখে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

প্রক্সি যুদ্ধের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা

আঞ্চলিক প্রক্সি বা ছায়াবাহিনীগুলোর মাধ্যমে আইআরজিসি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী 'ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের' ব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ১৯৮২ সালে গঠিত তাদের বিশেষ শাখা 'কুদস ফোর্স' লেবাননে হিজবুল্লাহ গঠনে সহায়তা করেছিল, যারা ১৮ বছর ধরে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে ২০০০ সালে ইসরায়েলি বাহিনীকে দক্ষিণ লেবানন থেকে পিছু হটতে বাধ্য করে। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে মার্কিন বাহিনীর ইরাক আক্রমণের পর আইইডি (বোমা) দিয়ে তাদের লক্ষ্যবস্তু বানায় কুদস-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়ারা। এই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগুলো আইআরজিসি নিশ্চিতভাবে মার্কিন আগ্রাসনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করবে।

‘অশুভ অক্ষ’ ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক

২০০১ সালের ৯/১১ হামলার পর আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সাময়িক জোট গঠন করলেও, ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরানকে ‘অশুভ অক্ষ’ (অ্যাক্সিস অব ইভিল)-এর অন্তর্ভুক্ত করেন। এরপর থেকে আইআরজিসির বিস্তার আরও বাড়ে। ওবামা প্রশাসনের সময় ২০১৪ সালে আইএস দমনে কিছু সহযোগিতা হলেও, ২০১৭ সালে ট্রাম্প পরমাণু চুক্তি থেকে সরে এলে পরিস্থিতি আবারও বৈরী হয়। আইআরজিসির চোখে, বর্তমান সংঘাত হলো ১৯৭৯ সালের পর থেকে তাদের ধ্বংস করার ধারাবাহিক মার্কিন প্রচেষ্টারই অংশ।

ক্ষমতা রক্ষা ও ‘ডিপ স্টেট’

বিগত এক মাসের বিমান হামলায় আইআরজিসি দুর্বল হলেও, তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা রক্ষায় তারা বদ্ধপরিকর। খামেনির মৃত্যুর পর তারা তার ছেলে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির পেছনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। আইআরজিসি কেবল একটি সেনাবাহিনী নয়; গণমাধ্যম থেকে শুরু করে নির্মাণ খাত পর্যন্ত অর্থনীতির অন্তত ২০ শতাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। এই বিশাল ‘ডিপ স্টেট’ বা রাষ্ট্রের ভেতরের রাষ্ট্র সহজে ভেঙে পড়ার নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আত্মসমর্পণ করার চেয়ে তারা শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।

​এম.এম/সকালবেলা

মন্তব্য করুন