ভিডিও
স্টোরি
ফটো স্টোরি
বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন: ভারতের সমকালীন জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক গুরু জগগি বাসুদেব, যিনি বিশ্বজুড়ে ‘সদগুরু’ নামে পরিচিত, তার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান ও মন্তব্য নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, তার আধ্যাত্মিক দর্শনের আড়ালে এক ধরনের সূক্ষ্ম ‘মুসলিম-বিদ্বেষ’ ও বর্ণবাদী চিন্তাধারা কাজ করছে, যা আধুনিক গণতান্ত্রিক ভারতের জন্য এক বড় ঝুঁকি।
২০১৮ সালে রাজস্থানের করণী সেনার তাণ্ডব এবং সিনেমা নিষিদ্ধের দাবিতে সরকারি বাস পোড়ানোর ঘটনাকে বাসুদেব ‘রাগ প্রকাশের ভারতীয় কায়দা’ এবং ‘অদ্ভুত প্রজ্ঞা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু ২০১৯ সালে যখন দেশজুড়ে সিএএ (CAA) বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়—যেখানে বিপুল সংখ্যক মুসলিম স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিলেন—তখন তার ভোল বদলে যায়। তিনি তখন আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনকে যৌক্তিক দাবি করে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আহ্বান জানান। এই বৈপরীত্য প্রশ্ন তোলে: তবে কি রাজপুতদের প্রতিবাদের প্রতি তার সহানুভূতি বেশি ছিল, নাকি আন্দোলনের কেন্দ্রে মুসলিমরা ছিল বলেই তার এই কঠোর রূপ?
বাসুদেবের বক্তব্যে মুসলিমদের একরৈখিক নেতিবাচক ছবি ফুটে ওঠে। তিনি অনেক সময় মুসলিমদের অতীতের ‘আক্রমণকারী’, বর্তমানের ‘দেশবিরোধী’ কিংবা ‘বর্বর’ হিসেবে চিত্রিত করেন। গত বছর লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের এক মুসলিম ছাত্রকে ‘তালিবানি’ বলে সম্বোধন করা তার এই মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। বিশ্লেষকরা মনে করেন, তিনি মুসলিমদের একটি প্রান্তিক বা ‘অস্পৃশ্য’ গোষ্ঠী (ম্লেচ্ছ) হিসেবে দাঁড় করাতে চান, যা ভারতের সংবিধানপ্রদত্ত সাম্যের ধারণার পরিপন্থী।
বাসুদেবের কাছে জাতপ্রথা, শবরীমালা মন্দিরে নারী প্রবেশে বাধা এবং গোরক্ষার মতো বিষয়গুলো মহান সভ্যতার লক্ষণ। অথচ এই উপাদানগুলো মূলত সমাজের সুবিধাবঞ্চিতদের ওপর উচ্চবর্ণের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ড. বি আর আম্বেদকর সতর্ক করেছিলেন যে, হিন্দু রাজ প্রতিষ্ঠিত হলে তা গণতন্ত্রের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। বাসুদেবের ‘বিশুদ্ধ’ আধ্যাত্মিক জগত যেন আম্বেদকরের সেই আশঙ্কারই এক নব্য সংস্করণ।
সদগুরুর ইংরেজি বলা আধুনিক আধ্যাত্মিকতা মূলত একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদকে প্রোমোট করে। তার এই বিশ্বদর্শনে ভারত কেবল ‘বিশুদ্ধ’ হিন্দুদের জন্য এক পবিত্র ভূমি, যেখানে মুসলিম বা ভিন্নমতালম্বীরা কেবলই ‘অন্য’ বা পর। তার এই দর্শন কার্যত রাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিক সহিংসতা ও বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে।
পরিশেষে, সমতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কোনো ধর্মীয় নেতার রাজনৈতিক ‘জ্ঞান’ অন্ধভাবে গ্রহণ করা বিপজ্জনক হতে পারে। জগগি বাসুদেবের আধ্যাত্মিকতা যদি রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকত, তবে হয়তো তা শান্তি আনত; কিন্তু বর্তমানে তা বিভাজন ও ভীতির সংস্কৃতিকেই বেশি উসকে দিচ্ছে।
এম.এম/সকালবেলা
| আজকের তারিখঃ বঙ্গাব্দ