বিশুদ্ধ পানির প্রতিটি ফোঁটায় লুকিয়ে আছে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। ছবি: এআই
বিশেষ প্রতিবেদন: দিনটি খুব সাধারণ আর আটপৌরে হতে পারত। ঢাকার আজিমপুরের একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে যথারীতি সকালের চেনা ব্যস্ততা শুরু হলো। ঘরের কল ছাড়তেই পানির বেগ জানান দিল—শহরে অন্তত ব্যবহারের পানির কোনো অভাব নেই। লাইনে পানি আছে, ট্যাঙ্কিও ভরা। কিন্তু আসল বিপত্তিটা বাঁধল যখন রান্নাবান্না আর তৃষ্ণা মেটানোর জন্য এক গ্লাস 'নিরাপদ' পানির প্রয়োজন হলো; তখন। কল থেকে পড়া চেনা পানিটার দিকে তাকিয়ে প্রতিবারের মতো এবারও মন সায় দিল না। কারণ, সরবরাহ যতই থাকুক, ঢাকার এই লাইনের পানি সরাসরি ফুটিয়ে বা ফিল্টার না করে পান করা মানেই জেনেশুনে রোগবালাইকে আমন্ত্রণ জানানো।
সেদিন সকালে ঘরে পানি ফোটানোর মতো পর্যাপ্ত সময় বা সুযোগ কোনোটাই ছিল না। আবার ওয়সার যে পাবলিক লাইন থেকে মাঝেমাঝে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করা হয়, রসূলবাগ পার্কের সেই লাইনে গিয়ে দেখা গেল উপচে পড়া ভিড়, সরবরাহও সাময়িক বন্ধ। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে কাছের দোকান থেকে চড়া দামে বোতলজাত পানি কিনে এনেই সেদিনের মতো তৃষ্ণা মেটানোর ন্যূনতম কাজ চালাতে হলো। আজিমপুরের এই ঘটনা কিন্তু বিচ্ছিন্ন কিছু নয়—কল খুললে পানি পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু তা পানের যোগ্য নয়। এই দ্বৈত বাস্তবতাই আজ মেগা সিটির তকমা পাওয়া ঢাকার বহু এলাকার মানুষের নিত্যদিনের চেনা এক চরম ভোগান্তির গল্প।
আজিমপুরের এই আধুনিক ফ্ল্যাটে দাঁড়িয়ে যখন প্লাস্টিকের বোতল থেকে পানি ঢালা হচ্ছিল, তখন স্মৃতি আচমকা স্লাইড শোর মতো পেছনে চলে যায়। মনে পড়ে যায় আজ থেকে প্রায় সতেরো-আঠারো বছর আগের কথা। তখন শৈশব কাটছিল উত্তর ঢাকার মোল্লারটেক এলাকায়। সে সময়কার ঢাকার পানির সংকট ছিল আরও বেশি আদিম, প্রকাশ্য এবং ভয়ংকর। তখন তো ব্যবহারের পানিই পাওয়া যেত না, টানা কয়েকদিন কল থেকে এক ফোঁটা পানি আসত না। পুরো এলাকায় তখন চলত পানির জন্য তীব্র হাহাকার। ভোরবেলা থেকে শুরু করে মাঝরাত পর্যন্ত বালতি, ড্রাম আর কলসি নিয়ে পানির খোঁজে দূর-দূরান্তে ছুটে বেড়াত মানুষ।
মাঝে কেটে গেছে প্রায় দুই দশক। এই দুই দশকে ঢাকা আজ দৃশ্যত আমূল বদলে গেছে। শহরের বুক চিরে ছুটে চলছে মেট্রোরেল, মাথার ওপর দিয়ে গেছে এক্সপ্রেসওয়ে ও চোখধাঁধানো উড়ালসেতু। নতুন নতুন আধুনিক অবকাঠামো আর বহুতল ভবনে সেজেছে রাজধানী। কিন্তু আঠারো বছর আগের মোল্লারটেকের সেই প্রকাশ্য পানির সংকটের স্মৃতি যখন আজ আজিমপুরের একটি আধুনিক ফ্ল্যাটে দাঁড়িয়ে 'নিরাপদ' পানির অভাবে বোতলজাত পানি কেনার মধ্য দিয়ে পুনরুজ্জীবিত হয়—তখন এই বাস্তবতা স্পষ্ট দেখিয়ে দেয়, ঢাকার পানির সংকট ও নাগরিক ভোগান্তি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। আগে সংকট ছিল পানির পরিমাণের, আর এখন সংকট পানির 'মানের' ও 'নিরাপত্তার'।
ঢাকার পানির এই গুণগত সংকট কোনো একক এলাকার বা নির্দিষ্ট শ্রেণির নয়, এর বিস্তার পুরো শহর জুড়ে একেক এলাকায় একেক রূপে দৃশ্যমান।দক্ষিণ ঢাকার যাত্রাবাড়ীর জুরাইন এলাকার এক বাসিন্দা নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, "অনেকে ভাবেন কল খুললেই তো পানি পাওয়া যাচ্ছে, তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো পানির মানে। অনেক সময় সারাদিন অফিস খাটুনি শেষে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরেও যে পানিটা পাই, তা সরাসরি মুখে তোলার উপায় থাকে না। কখনো পানিতে তীব্র গন্ধ থাকে, কখনো কালচে রঙ। ফলে বাধ্য হয়ে শুধু বেঁচে থাকার জন্য, পান করার পানির জন্য প্রতি সপ্তাহে আলাদা করে বড় বড় বোতলজাত বা জারের পানি কিনতে হয়। এটা আমাদের ওপর বাড়তি এক মানসিক ও আর্থিক নির্যাতন।"
নগরের অন্য প্রান্তের চিত্রও খুব একটা ভিন্ন নয়। হাসনাবাদ এলাকার আরেক বাসিন্দা জানান, "ছয়-সাত বছর আগেও তাদের এলাকায় পানির সংকট ছিল প্রায় নিয়মিত ঘটনা। তখন পানি পাওয়ার জন্য ভোর বা গভীর রাতে অ্যালার্ম দিয়ে জেগে থাকতে হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওয়াসার লাইনে পানির পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন এবং শতভাগ নিরাপদ পানের পানির নিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। কল থেকে সরাসরি পানি খাওয়ার ভরসা আমরা এখনো পাই না।"
পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার পানির এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের পেছনে রয়েছে গভীর কাঠামোগত ও ভূগর্ভস্থ বাস্তবতা। ঢাকা ওয়াসার নিজস্ব বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বার্ষিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজধানীর পানির একটি বিশাল অংশ (প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ) এখনো ভূগর্ভস্থ উৎসের অর্থাৎ মাটির নিচের পানির ওপর নির্ভরশীল। মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পানি আসে সায়েদাবাদ বা অন্যান্য শোধনাগারের উপরিভাগের নদী থেকে। জনসংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধির কারণে মাটির নিচের এই পানির স্তরের ওপর চাপ মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। বিভিন্ন পরিবেশ গবেষণা সংস্থার দীর্ঘদিনের জরিপে উঠে এসেছে, ঢাকার অনেক এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে ২ থেকে ৩ মিটার নিচে নেমে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের শতভাগ কংক্রিটের পিচঢালা রাস্তার কারণে বৃষ্টির পানি আর স্বাভাবিক নিয়মে মাটির নিচে রিচার্জ হতে পারছে না। ফলে পাম্পগুলো গভীর স্তরে গিয়েও অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি টানে না, যার প্রভাব পড়ে সরবরাহ লাইনে।
এর পাশাপাশি রয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ অবকাঠামো। ঢাকা শহরের মাটির নিচে থাকা পাইপলাইনগুলোর সিংহভাগই কয়েক দশকের পুরোনো। এই পুরোনো পাইপলাইনের লিকেজ, ফাটল ও অবৈধ সংযোগের কারণে ওয়াসার উৎপাদিত পানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রাহকের বাড়ি পৌঁছানোর আগেই মাটির নিচেই নষ্ট হয়, যা সিস্টেম লস নামে পরিচিত। সবচেয়ে বড় ভয়ের ব্যাপার হলো, এই জরাজীর্ণ পাইপলাইনের ফাটল দিয়ে সুয়ারেজের ময়লা ও ব্যাকটেরিয়া ভেতরের লাইনে ঢুকে পড়ে। ফলে শোধনাগার থেকে পানি শতভাগ বিশুদ্ধ আকারে ছাড়লেও, গ্রাহকের কল পর্যন্ত আসতে আসতে তা দূষিত হয়ে যায় এবং পানির মান ও নিরাপত্তা নিয়ে নাগরিক মনে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়।
এর ফলে একই সেবার জন্য নাগরিকদের একাধিকবার পকেটের টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। প্রথমত নাগরিককে প্রতি মাসে নিয়ম করে পানির বিল দিতে হয়। দ্বিতীয়ত সেই পানিকে খাওয়ার উপযোগী করতে অতিরিক্ত গ্যাস বা বিদ্যুৎ পুড়িয়ে ফুটাতে হয়, অথবা ফিল্টার রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়। সব মিলিয়ে পানি এখন শুধু একটি মৌলিক নাগরিক সেবা নয়, বরং সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি বড় নিয়মিত অর্থনৈতিক বোঝা।
একটি শহরের প্রকৃত এবং টেকসই উন্নয়ন শুধু রাস্তা, উড়ালসেতু, এক্সপ্রেসওয়ে বা আকাশচুম্বী ভবনের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। উন্নয়নের আসল ও একমাত্র মানদণ্ড হলো একজন সাধারণ নাগরিক তার দৈনন্দিন জীবনে কতটা নিরাপদ, মর্যাদাশীল ও নিশ্চিন্ত জীবন যাপন করতে পারছে।
একজন নাগরিক যদি দিনশেষে নিজের ঘরের কলটি খুলে কোনো ভয়, সংশয় বা দ্বিধা ছাড়া নির্ভয়ে এক গ্লাস পানি সরাসরি পান করতে না পারেন, তবে দৃশ্যমান মেগা প্রজেক্টের সেই বাহ্যিক উন্নয়নের আসল অর্থ কতটুকু?
ঢাকার উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার গল্প তাই শুধু কংক্রিটের অবকাঠামোর চাকচিক্যের নয়, তা আসলে নাগরিক অধিকার ও আস্থার গভীর গল্প। দুই দশকের ব্যবধানে শহর বদলেছে, আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে; কিন্তু প্রতিটি তৃষ্ণার্ত মানুষের আদিম পানির প্রশ্নটি এখনো একই জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে আছে—এক গ্লাস নিশ্চিন্ত ও নিরাপদ পানির অপেক্ষায়।
-রাকিব হাসান