ভালুকায় ইটভাটার মালিকানা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, প্রশাসনের হস্তক্ষেপের আহ্বান
মোঃ জাকির হোসাইন রাজু, ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি: ময়মনসিংহের ভালুকায় ইটবোঝাই একটি গাড়ি আটকে রেখে ভেতরের ইট জোরপূর্বক নামিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ধীতপুর ইউনিয়নের রান্দিয়া বাজারে এই ঘটনা ঘটে। ৭৭৭ ব্রিকস ফিল্ড থেকে কেনা ইট গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার পথে এই বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটে বলে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়ার পথে রান্দিয়া বাজারে গাড়িটি পৌঁছালে কতিপয় ব্যক্তি এর গতিরোধ করে। চালক ও সহযোগীদের বাধা উপেক্ষা করে তারা গাড়ি থেকে ইট নামিয়ে রেখে দেয়।
ক্রেতা সোহেল মিয়া জানান, তিনি ৭৭৭ ব্রিকস ফিল্ড থেকে এক হাজার ইট কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। রান্দিয়া বাজারে এলে সাবেক মেম্বার খন্দকার শামীনুল হক শামিমের নেতৃত্বে একদল লোক বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর আলমের হুকুমে গাড়িটি থামিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রাখে। সোহেল মিয়া বিষয়টি ভালুকা উপজেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক মেজবা উদ্দিন মাসুদকে জানালে তিনি ফোনে গাড়িটি ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু তাতেও কোনো সুরাহা হয়নি। বাধা প্রদানকারীরা জানান যে জাহাঙ্গীর আলম অনুমতি দিলে গাড়ি ছাড়া হবে। পরে তারা জোরপূর্বক গাড়ি থেকে ইট নামিয়ে রেখে দেয়। ক্রেতা ও সংশ্লিষ্টরা পরে ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান হালিম উদ্দিন সরকার রিপনকে বিষয়টি অবহিত করেন।
ইটভাটাটির পরিচালনা পর্ষদের অন্যতম মালিক সেলিম হোসেন জানান, তারা ত্রিশাল উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নে অবস্থিত এই ইটভাটাটি জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে কিনে আইন মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তার দাবি, বিগত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে ভালুকা উপজেলার ধীতপুর ইউনিয়নের বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর আলম তাদের কাজে বিভিন্নভাবে বাধা প্রদান করে আসছেন। এ বিষয়ে দ্রুতই আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে তারা জানান।
৭৭৭ ব্রিকস ফিল্ডের ম্যানেজার ইলিয়াস মিয়া জানান, তার পরিবার ও কোম্পানি নিয়ম মেনে আলম মাস্টারের কাছ থেকে এই ইটভাটা কিনেছে এবং এর সমুদয় বৈধ কাগজপত্র তাদের কাছে রয়েছে। তার অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের পর থেকে বিএনপি দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে তাদের ব্যবসা ও পণ্য পরিবহনে বারবার হয়রানি করা হচ্ছে। রান্দিয়া ও শিবগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের বিক্রিত ইটের গাড়ি আটকে দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর আলম তার বিরুদ্ধে ওঠা রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ইটভাটাটি একসময় তার মালিকানাধীন ছিল। বিগত সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভয় দেখিয়ে ও জানের ঝুঁকিতে ফেলে জোরপূর্বক ভাটাটি তার কাছ থেকে লিখে নেওয়া হয়। ৫ আগস্টের পর তিনি সাবেক মালিক হিসেবে এটি ফেরত চান এবং দলীয় ঊর্ধ্বতন নেতৃত্ব ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদের শরণাপন্ন হন।
জাহাঙ্গীর আলমের দাবি, সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে বিচারে প্রমাণিত হয় যে তার কাছ থেকে এটি জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছিল। বিচারকাজে তাদের মিউচুয়াল করার কথা বলা হলেও বর্তমান পরিচালকরা তা না মেনে মালামাল বিক্রির চেষ্টা করছেন। ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত ইট বের না করতে বলার কারণেই তিনি বাধা দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন। অন্যের ইট আটকানো বা সন্ত্রাসী কায়দায় হয়রানির বিষয়ে তিনি বলেন, এটি তার জীবন ও ব্যবসার অস্তিত্বের লড়াই এবং এখানে দলীয় প্রভাবের কোনো বিষয় নেই।
ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান হালিম উদ্দিন সরকার রিপন জানান, উক্ত ইটভাটা সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্তে জানা গেছে যে নারায়ণগঞ্জের সেলিম হোসেনসহ কয়েকজন ২০২৩ সালে জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে ভাটাটি কিনে নিয়েছেন। বর্তমানে এতে জাহাঙ্গীর আলমের কোনো আইনি সত্যতা বা মালিকানা নেই।
ইটভাটার জমিদাতারা জানান, জাহাঙ্গীর আলমকে প্রথমে ৫ বছর এবং পরে আরও ৫ বছরের জন্য জমি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। ১০ বছর পার হওয়ার পর তিনি সঠিক সময়ে জমির ভাড়া পরিশোধ করতে পারেননি এবং মানুষের পাওনা ইটও দিতে পারছিলেন না। টানা ৪ বছর ভাড়া না দিয়ে ভাটা বন্ধ রাখার পর তিনি মালামাল বিক্রি করে চলে যান। পরবর্তীতে নতুন মালিকরা এসে জমির ভাড়া নিয়মিত পরিশোধ করছেন। জমিদাতারা স্পষ্ট জানান, তারা জাহাঙ্গীর আলমকে আর ভাটা চালাতে দেবেন না।
মালিকানা হস্তান্তর, লেনদেন ও বিগত সময়ের ঘটনা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য থাকায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো স্থানীয় সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদের হস্তক্ষেপ কামনা করে সব কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত মালিকানা ও লেনদেনের সঠিক সুরাহার আহ্বান জানিয়েছেন।
এআইএল/সকালবেলা