৫০ পয়সার রসিদে ৪৭ বছরের রাজনৈতিক পথচলা আবুল হোসেনের

প্রকাশ: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৪ অপরাহ্ণ
৫০ পয়সার রসিদে ৪৭ বছরের রাজনৈতিক পথচলা আবুল হোসেনের

মোস্তাকিন হোসেন, পাঁচবিবি (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি: এক টুকরো বিবর্ণ কাগজ, যার বয়স প্রায় ৪৭ বছর। অর্থমূল্য ছিল মাত্র ৫০ পয়সা, অথচ সময়ের স্রোত পেরিয়ে সেই কাগজটিই আজ হয়ে উঠেছে একজন মানুষের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অমূল্য স্মারক।

১৯৭৯ সালে ছাত্রজীবনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সদস্য হওয়ার সেই রসিদটি আজও পরম যত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছেন জয়পুরহাটের পাঁচবিবি পৌরসভার দমদমা মহল্লার আবুল হোসেন খায়ের স্বপন।

কাগজটি এখন জীর্ণ, বিবর্ণ হয়ে গেছে তার রং, কোথাও কোথাও সময়ের ক্ষত স্পষ্ট। তবুও মুছে যায়নি তার ইতিহাস; এখনও পড়া যায়—‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল’ এবং ‘সদস্যভুক্ত হওয়ার রসিদ’। সেখানে রয়েছে সদস্যভুক্তির ক্রমিক নম্বর, নাম, পিতার নাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম, থানা ও জেলার তথ্যসহ প্রয়োজনীয় বিবরণ। নিচে রয়েছে সদস্য ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বাক্ষর। আজকের দিনে ৫০ পয়সা নগণ্য হলেও ৪৭ বছর আগে দেওয়া সেই ৫০ পয়সাই স্বপনের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম স্বাক্ষর। একটি ছোট্ট রসিদ থেকে শুরু হওয়া পথচলা সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হয়েছে স্থানীয় রাজনীতি থেকে জেলা পর্যায়ের কর্মকাণ্ডে।

যে রসিদে শুরু হয়েছিল পথচলা

আবুল হোসেন খায়ের স্বপনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালে জয়পুরহাট সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর দাবি, তিনি জয়পুরহাট সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের একজন।

তাঁর কাছে সংরক্ষিত রসিদটি সেই সময়েরই স্মারক। সদস্যভুক্তির প্রক্রিয়া, সদস্যের পরিচয় এবং সংগঠনের প্রতি অঙ্গীকার—সবকিছুরই ছাপ রয়েছে ওই কাগজে। একটি রসিদ কখনও কেবল অর্থ লেনদেনের প্রমাণ থাকে না; সময়ের ব্যবধানে সেটিই হয়ে উঠতে পারে জীবনের একটি অধ্যায়ের দলিল। স্বপনের কাছে ১৯৭৯ সালের এই রসিদ ঠিক তেমনই এক দলিল।

ছাত্রদল থেকে বিএনপির রাজনীতিতে

ছাত্রজীবনে রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন স্বপন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি পাঁচবিবি থানা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং পাঁচবিবি মহীপুর হাজী মহসীন সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে তিনি যুবদল ও বিএনপির রাজনীতিতেও বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি পাঁচবিবি থানা যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি, পাঁচবিবি থানা বিএনপির সদস্য, পাঁচবিবি পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জয়পুরহাট জেলা বিএনপির সদস্য ও প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে কলেজের তরুণ শিক্ষার্থী হিসেবে যে রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা পরিণত হয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায়।

কেন আজও আগলে রেখেছেন ৫০ পয়সার রসিদ?

প্রায় পাঁচ দশক ধরে একটি পুরোনো কাগজ কেন এত যত্নে রেখে দিয়েছেন?—এমন প্রশ্নের উত্তরে আবেগে আপ্লুত হন স্বপন।

তিনি বলেন, এই রসিদ শুধু তাঁর ছাত্রদলের সদস্য হওয়ার কাগজ নয়; এটি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিনের স্মৃতি। জীবনের নানা উত্থান-পতন, রাজনৈতিক পরিবর্তন, আন্দোলন-সংগ্রাম ও সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও তিনি রসিদটি ফেলে দেননি।

তাঁর ভাষায়, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল প্রতিষ্ঠা করেন। তখন আমি জয়পুরহাট সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সেই সময় সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত হই। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছি। সদস্য হওয়ার সময় পাওয়া এই রসিদটি আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। তাই প্রায় ৪৭ বছর ধরে এটি যত্ন করে সংরক্ষণ করে রেখেছি।”

রাজনীতির দীর্ঘ পথের আরেক অধ্যায় মামলা

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে মামলা-মোকদ্দমার অভিজ্ঞতার কথাও জানান আবুল হোসেন খায়ের স্বপন।

তাঁর দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়ার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র, বিস্ফোরক ও ককটেল বোমা-সংক্রান্ত দুটি মামলা হয়। পরে পাঁচবিবি থানা পুলিশ ওই মামলাগুলোতে ফাইনাল চার্জশিট দেয় বলেও তিনি দাবি করেন।

তৎকালীন পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, তাঁকে আটক করা হবে কি না—এ নিয়ে তৎকালীন ডিএসবি কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ ছিল। কেউ তাঁকে আটক করার পক্ষে ছিলেন, আবার কেউ বলেছিলেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি—তাহলে তাঁকে কেন আটক করা হবে?

৫০ পয়সার কাগজ, ৪৭ বছরের স্মৃতি

সময় অনেক কিছু বদলে দেয়—বদলে যায় মানুষ, বদলে যায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সংগঠনের কাঠামো ও নেতৃত্বের ধরন। কিন্তু কিছু স্মৃতি থেকে যায় নীরবে, নিভৃতে। আবুল হোসেন খায়ের স্বপনের কাছে সেই স্মৃতির নাম একটি ৫০ পয়সার রসিদ।

১৯৭৯ সালের সেই ছোট্ট কাগজটি আজ আর বাজারে কোনো আর্থিক মূল্য বহন করে না, কিন্তু একজন মানুষের জীবনের কাছে এর গুরুত্ব অনেক। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর তারুণ্য, ছাত্রজীবন, রাজনীতিতে প্রবেশ, দায়িত্ব পালন, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং দীর্ঘ পথচলার স্মৃতি।

একটি রসিদ দিয়ে কোনো মানুষের পুরো রাজনৈতিক জীবনকে মাপা যায় না, কিন্তু তা রাজনৈতিক যাত্রার শুরুর মুহূর্তটিকে ধরে রাখতে পারে—যেমনটি ধরে রেখেছে স্বপনের ৫০ পয়সার সেই কাগজটি। প্রায় পাঁচ দশক ধরে যত্নে রাখা ওই বিবর্ণ রসিদ তাই কেবল একটি পুরোনো কাগজ নয়; এটি একজন মানুষের জীবনের একটি সময়ের দৃশ্যমান স্মারক এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের এক ক্ষুদ্র কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ দলিল।

আজ কাগজটির বয়স ৪৭ বছর। এর অক্ষরগুলো হয়তো সময়ের ভারে ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে, কিন্তু স্মৃতির ক্যানভাসে তা আজও স্পষ্ট। ৫০ পয়সার সেই রসিদ যেন বলে যায়—সময় চলে যায়, প্রজন্ম বদলায়, রাজনীতির দৃশ্যপট বদলায়; কিন্তু মানুষের জীবনে কিছু স্মৃতি থাকে, যেগুলোর মূল্য টাকা দিয়ে কখনও পরিমাপ করা যায় না।

এআইএল/সকালবেলা


মন্তব্য করুন