নিজস্ব প্রতিবেদক: নানা আলোচনা-সমালোচনা ও একগুচ্ছ অনিয়মের অভিযোগের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ড. আহসান এইচ মনসুরকে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মোস্তাকুর রহমান। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এই নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
নবনিযুক্ত গভর্নর মোস্তাকুর রহমান একজন অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ। তিনি ২০২৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক থেকে পরিচালক পদে পদোন্নতি পান। এর আগে তিনি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অতিরিক্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এখন তাঁর প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিলেও শুরু থেকেই তিনি বিতর্কের জন্ম দেন। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের একগুচ্ছ অভিযোগ তুলে ধরে। কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়:
তথ্য পাচার ও তদ্বির বাণিজ্য: বিএফআইইউ-এর গোপন ও স্পর্শকাতর তথ্য গভর্নরের স্ত্রী ও ব্যক্তিগত সচিবের মাধ্যমে একটি সিন্ডিকেটের কাছে পাচার করার অভিযোগ উঠেছে, যারা অর্থের বিনিময়ে বন্ধ অ্যাকাউন্ট সচল করার ‘তদ্বির বাণিজ্য’ চালাত।
বিলাসবহুল গাড়ি কেনা: ব্যয় সংকোচন নীতি লঙ্ঘন করে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজকে উপেক্ষা করে প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের ‘টয়োটা আলফোর্ড’ গাড়ি কেনা হয়েছে। এছাড়া গভর্নরের পরিবার নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যাংকের ৪টি গাড়ি ব্যবহার করছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
স্বার্থের সংঘাত ও ডিজিটাল ব্যাংক: ব্র্যাক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর পুরোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক রক্ষায় ‘বিকাশ’ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে আইনি বিধিনিষেধ তোয়াক্কা না করে নজিরবিহীন তাড়াহুড়ো করেছেন তিনি।
সিএসআর ফান্ডের অপব্যবহার: নিয়মনীতি ভেঙে নিজের শৈশবের বিদ্যাপীঠ, টাঙ্গাইলে নিজের মালিকানাধীন বাগানবাড়ির পাশের বিদ্যালয় এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রতিষ্ঠানে সিএসআর ফান্ড থেকে কোটি কোটি টাকা অনুদান দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ওষুধ জালিয়াতি: মেডিকেল সেন্টারে ওষুধ থাকা সত্ত্বেও ‘নো-স্টক’ স্লিপ নিয়ে বাইরে থেকে বানোয়াট বিল তৈরি করে অর্থ উত্তোলনের মতো ক্ষুদ্র ও লজ্জাজনক অনিয়মের অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।
গভর্নরের এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোয় এবং সংবাদ সম্মেলন করায় অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের তিন শীর্ষ নেতাকে শাস্তিমূলকভাবে ঢাকার বাইরে (বরিশাল, রংপুর ও বগুড়া) বদলি করা হয়েছিল। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আহসান এইচ মনসুর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এক ধরনের ‘স্বৈরাচারী’ শাসন কায়েম করেছিলেন।
অবশেষে এসব অভিযোগ ও তীব্র অসন্তোষের মুখে তাঁকে সরিয়ে নতুন গভর্নর নিয়োগের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিল সরকার।
এম.এম/সকালবেলা