ইউনিফর্ম পরে আ.লীগের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামানকে বাধ্যতামূলক অবসর

প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৭ অপরাহ্ণ
ইউনিফর্ম পরে আ.লীগের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামানকে বাধ্যতামূলক অবসর
পুলিশের ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান।

নিজস্ব প্রতিবেদক: পুলিশের নির্ধারিত পোশাক (ইউনিফর্ম) পরিহিত অবস্থায় একটি রাজনৈতিক দলের দলীয় মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নেওয়ার গুরুতর অপরাধ ও অসদাচরণের অভিযোগে ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামানকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছে সরকার।

আজ সোমবার (২০ জুলাই) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সই করা এক বিশেষ সরকারি প্রজ্ঞাপনে এই শাস্তিমূলক আদেশ জারি করা হয়।

প্রজ্ঞাপনে ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ঝিনাইদহ-১ আসনের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকা মার্কার মনোনয়নপ্রত্যাশী (অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামানের আপন ছোট ভাই) মো. ওয়াহিদুজ্জামান ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত দলটির কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কার্যালয়ে মনোনয়নপত্ৰ জমা দিতে যান। সেই সময় তৎকালীন কর্মরত অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে পুলিশের ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন এবং দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

একটি শৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ ও দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে এটি চরম শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ, উপ-নির্বাচনে সরকারি পদের বেআইনি প্রভাব বিস্তারের অপকৌশল এবং জনসম্মুখে বাংলাদেশ পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করার শামিল। এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগে পরবর্তীতে তাঁর বিরুদ্ধে একটি উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয় এবং তাঁকে কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ দেওয়া হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাবে তিনি একটি লিখিত বক্তব্য দাখিল করলেও ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশ নিতে কোনো ধরণের আগ্রহ প্রকাশ করেননি। পরবর্তীতে এই ঘটনা খতিয়ে দেখতে গঠিত তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত বোর্ড অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগের সত্যতা পায়।

এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় দফায় চূড়ান্ত কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হলেও তিনি প্রশাসনের কাছে কোনো জবাব দাখিল করেননি। তদন্ত বোর্ডের প্রতিবেদন ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে ‘অসদাচরণ’ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একাত্মতা ও পূর্ণ দ্বিমত পোষণ না করে সম্মতি প্রকাশ করে। সর্বশেষ নিয়োগকারী সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে মহামান্য রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত অনুমোদনের পর মো. মনিরুজ্জামানকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’-এর মতো গুরুদণ্ড প্রদান করা হলো।

বিগত সরকারের পতনের পর দেওয়া সেই বিতর্কিত আবেদনপত্র উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঠিক পরদিন, অর্থাৎ ১১ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে স্বেচ্ছায় অবসর চেয়ে একটি চাঞ্চল্যকর আবেদনপত্র জমা দিয়েছিলেন এই কর্মকর্তা।

সেই বিশেষ আবেদনপত্রে মো. মনিরুজ্জামান লিখেছিলেন, ‘মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র কিতাবের সর্বশেষ পরিপূর্ণ সংস্করণ আল কোরআনের জ্ঞান ও ন্যায়-অন্যায় বোধের প্রজ্ঞা দান করায় আমি এখন অনুধাবন করতে পারছি যে, বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে আর চাকরি করা আমার জন্য কোনোভাবেই সমীচীন নয়। এ কারণে ১১ আগস্ট আমি পুলিশে আমার পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করলাম।’

আবেদনপত্রে তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশের দলীয় ভূমিকা ও মন্ত্রীদের অনৈতিক আদেশের তীব্র সমালোচনা করে লিখেছিলেন, ‘বিগত ১০ বছরে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীদের অবৈধ রাজনৈতিক আদেশ পালন ও পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বর্বর ও নৃশংস আদেশে শিশু-কিশোরসহ বহু সাধারণ মানুষকে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা নির্বিচারে হত্যা করেছেন। যার চরম পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী আজ সাধারণ মানুষের কাছে একটি গণশত্রুতে পরিণত হয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের ঘৃণার পাত্র হিসেবে আমি আর পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছুক নই।’ তিনি ছাত্র-জনতার ওপর তৎকালীন প্রশাসনের ক্র্যাকডাউনকে 'নিষ্ঠুরতম ও ইতিহাসের কালো অধ্যায়' হিসেবেও আখ্যা দিয়েছিলেন। তবে সেই আবেদনের সুরাহা হওয়ার আগেই পূর্বের অসদাচরণের বিভাগীয় মামলায় শাস্তিস্বরূপ তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলো।

মন্তব্য করুন