জর্ডানে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

প্রকাশ: বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২০ পূর্বাহ্ণ
জর্ডানে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও মার্কিন বাহিনীর পাল্টাপাল্টি সামরিক সংঘাত (প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত/এএফপি)।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নিজেদের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ তেলবাহী ট্যাংকারে মার্কিন হামলার কঠোর প্রতিশোধ হিসেবে জর্ডানে অবস্থিত একটি প্রধান মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরানের এলিট ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির বরাতে আজ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে গত ছয় মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সামরিক সংঘাত এক সর্বাত্মক ও বিধ্বংসী আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় মঙ্গলবার, যখন হরমুজ প্রণালী সংলগ্ন এলাকায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলার অভিযোগ তুলে ইরানের পাঁচটি তেলবাহী বাণিজ্যিক ট্যাংকার সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস করে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এক সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে দুই পরাক্রমশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে এটি ছিল দ্বিতীয় দফা বড় ধরনের সামরিক আঘাত।

এর জবাবে আজ বুধবার ভোরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ (IRNA) জানায়, তেল ট্যাংকার ধ্বংসের এই ‘শাস্তিমূলক অভিযানের’ অংশ হিসেবে জর্ডানের আল-আজরাক মার্কিন বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে একঝাঁক দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। আইআরজিসির দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রের সুনির্দিষ্ট আঘাতে ঘাঁটির অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত স্থাপনা, সামরিক যুদ্ধবিমান মোতায়েনের রানওয়ে এবং বিমানের সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা অন্তত ১৮টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সফলভাবে গুলি করে ভূপাতিত করা হয়েছে।

ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাত্র কয়েক মিনিট পূর্বে এক চরম সতর্কবার্তা জারি করে রেভল্যুশনারি গার্ডস জানায়, মার্কিন আগ্রাসনের প্রত্যুত্তরে ওয়াশিংটনের মিত্র কুয়েত ও বাহরাইনের উপকূলীয় এলাকায় অবস্থানরত সকল আন্তর্জাতিক তেলবাহী বাণিজ্যিক জাহাজকেও এবার লক্ষ্যবস্তু করা হবে। একই সাথে প্রাণহানি এড়াতে সেসব জাহাজে কর্মরত ক্রু ও নাবিকদের দ্রুত জাহাজ ত্যাগ করে নিরাপদ দূরত্বে চলে যাওয়ার আলটিমেটাম দেয় তেহরান।

এর আগে মঙ্গলবার দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, “ইরান ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে হামলা চালাচ্ছে বা চালানোর অপচেষ্টা করছে। এর জবাবে প্রতিবারই ইরানকে নিজেদের তেলবাহী ট্যাংকার হারিয়ে মূল্য দিতে হবে এবং সামরিক প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও এ ধরনের কঠোর ধ্বংসাত্মক অভিযান অব্যাহত থাকবে।” ওই দিন ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি বড় ইরানি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আলী আবদোল্লাহি সাফ জানিয়েছিলেন, ইরানের কোনো জাহাজে আঘাত এলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে আগুনের মুখে পড়তে হবে।

এদিকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এক বিশাল ধাক্কা লেগেছে। বুধবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক মাইলফলকে গিয়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দর ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৩৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেল সূচক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)-এর দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪ দশমিক ৫১ ডলারে।

সংঘাতের শুরু থেকেই কৌশলগত হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের পূর্ণ সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ইরান। বিশ্বের মোট তোল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হওয়া এই সংবেদনশীল নৌপথটিতে সংঘাতের জেরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখন প্রায় পুরোপুরি অচল।

এরই মধ্যে মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালী থেকে একটি ‘অত্যাধুনিক চালকবিহীন মার্কিন সাবমেরিন ড্রোন’ জব্দ করার দাবি করে আইআরজিসি। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এটিকে পুরোনো মডেলের একটি ত্রুটিযুক্ত যান আখ্যা দিয়ে স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের দাবি নাকচ করেছে। এ ছাড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে দুটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ (ডেস্ট্রয়ার)-এ সরাসরি আঘাত হানার দাবি করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ ও সমুদ্রসীমা এখন বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে।

মন্তব্য করুন