বৈরুতের মিশ্র জনগোষ্ঠীর এলাকা এবং সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায়ও হামলা হয়েছে। ৬ এপ্রিল বৈরুতের উপকণ্ঠে আইন সাদেহতে খ্রিস্টান লেবানিজ ফোর্সেসের শীর্ষ নেতা পিয়েরে মুয়াওয়াদ ও তার স্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য লেবানিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি করাই ইসরাইলের লক্ষ্য। কিন্তু এই হামলার মধ্যেও সবচেয়ে বড় চমক দিচ্ছে হিজবুল্লাহ। ২০২৪ সালের যুদ্ধে পরাজিত ভেবে যে সংগঠনকে ইতিহাসের পাতায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, তারা ফিরে এসেছে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে।
আগের যুদ্ধে হিজবুল্লাহর প্রায় চার হাজার যোদ্ধা নিহত হয়েছিলেন। শীর্ষ নেতৃত্ব হত্যা করা হয়েছিল। ২৭ নভেম্বর ২০২৪-এর যুদ্ধবিরতির পর ১৫ মাস তারা চুপ ছিল। এই সময়ে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ইসরাইল ১০ হাজার বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে এবং হিজবুল্লাহর প্রায় ৪০০ সদস্য নিহত হয়েছেন। তাই সবাই মনে করেছিল সংগঠনটি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু ২ মার্চ হিজবুল্লাহ লেবানন ফ্রন্ট খুলে দেওয়ার পর সব হিসাব পাল্টে গেছে। অবসরপ্রাপ্ত লেবানিজ জেনারেল এলিয়াস ফারহাত বলেছেন, ‘এটা স্পষ্ট যে হিজবুল্লাহ তার সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করেছে।’ ইসরাইলি উত্তরাঞ্চলীয় কমান্ড প্রধান মেজর জেনারেল রাফি মিলো নিজেও স্বীকার করেছেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহর এই পুনর্গঠনের ক্ষমতায় ‘অবাক’ হয়ে গেছে।
২ থেকে ৩০ মার্চের মধ্যে হিজবুল্লাহ ইসরাইলে পাঁচ হাজারেরও বেশি রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। ২৬ মার্চ একটি দিনেই ৬০০-রও বেশি প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ করা হয়েছে। কাতারের আল-আরাবি আল-জাদিদ চ্যানেল জানিয়েছে, ইসরাইলি হিসাব অনুযায়ী হিজবুল্লাহ পাঁচ মাস পর্যন্ত প্রতিদিন ২০০টি রকেট ও ড্রোন ছোড়ার ক্ষমতা রাখে। দক্ষিণ লেবানন ফ্রন্টে ইসরাইলের ক্ষতিও উল্লেখযোগ্য। এখন পর্যন্ত ১১ জন ইসরাইলি সেনা নিহত ও ৩০০-রও বেশি আহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহর দাবি, তারা ১৩৬টি মার্কাভা ট্যাংক ও ২৬টি সামরিক যান ধ্বংস করেছে। পাঁচটি ডিভিশন ও বেশ কয়েকটি এলিট রেজিমেন্ট নিয়ে এক মাসেরও বেশি সময় অভিযান চালিয়ে ইসরাইল মাত্র ২০৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে পেরেছে। এটি লেবাননের মোট ভূখণ্ডের মাত্র দুই শতাংশ।
হিজবুল্লাহ কীভাবে এত দ্রুত পুনর্গঠিত হলো? সংগঠনটির তৃতীয় প্রজন্মের কমান্ডাররা — যাদের বয়স ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে — এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জেনারেল ফারহাত বলেছেন, ‘নতুন কমান্ডাররা তরুণ, উচ্চশিক্ষিত এবং বিজ্ঞান ও কারিগরি ক্ষেত্রে ডিগ্রিধারী। ইসরাইলি বাহিনীর সঙ্গে বর্তমান সংঘাতে তাদের পেশাদারিত্ব ও সামরিক জ্ঞানের প্রমাণ মিলছে।’ ইসরাইলের গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হিজবুল্লাহ এখন হাতে লেখা নোট ও মানব বার্তাবাহক ব্যবহার করছে। এ কারণেই ব্যাপক বিমান হামলার পরেও ইসরাইল নতুন নেতৃত্বকে চিহ্নিত করে হত্যা করতে পারছে না।
হিজবুল্লাহ বিশেষজ্ঞ আমাল সাদ এই রণকৌশলকে ‘মুগনিয়েহ মডেলে’ ফিরে যাওয়া বলে বর্ণনা করেছেন। ছোট দলে বিভক্ত, গেরিলা কায়দায় চলমান এবং অতর্কিত হামলার এই কৌশল ২০০৬ সালের যুদ্ধেও ব্যবহার করা হয়েছিল। এমনকি মার্কিন সামরিক ম্যানুয়ালেও এই মডেল নিয়ে আলোচনা রয়েছে। অস্ত্রের দিক থেকেও হিজবুল্লাহ নতুন সক্ষমতা দেখাচ্ছে। ইরানি আলমাস ২ ও ৩ ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। ১৮ মার্চ সীমান্ত থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে আশকেলনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করা হয়েছে। ৬ এপ্রিল লেবানিজ উপকূলে একটি ইসরাইলি নৌযানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবিও করেছে সংগঠনটি।
একটি লেবানিজ নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর প্রায় ৩৫ হাজার সক্রিয় যোদ্ধা আছেন এবং আরও ৫০ হাজার রিজার্ভ যোদ্ধা আছেন অপেক্ষায়। গত ডিসেম্বরে সামরিক কমান্ডাররা মহাসচিব নাইম কাসেমকে জানিয়েছিলেন, পুনর্গঠনের কাজ শেষ এবং ‘প্রতিরোধ নতুন সংঘাতের জন্য প্রস্তুত।’ তখন অনেকে এটাকে প্রচারণা ভেবেছিলেন। রণক্ষেত্রের বাস্তবতা এখন বলছে, সেটা মোটেও প্রচারণা ছিল না।
আই.এ/সকালবেলা