নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে এসএমইউসিটিতে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

প্রকাশ: রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৪ অপরাহ্ণ
নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে এসএমইউসিটিতে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত

মাহমুদ হাসান পিয়াল: দেশ-বিদেশের শিক্ষাবিদ ও উন্নয়নকর্মীরা উত্তরার শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে (এসএমইউসিটি) “নারীর প্রতি সহিংসতা ও সীমান্ত পেরোনো আন্তর্জাতিক নারীবাদ” শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক গোলটেবিল আলোচনায় মিলিত হয়েছেন। শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের আয়োজনে এবং নারী অধিকারকর্মী ও গবেষকদের আন্তর্জাতিক সংহতি নেটওয়ার্ক ‘উইমেন লিভিং আন্ডার মুসলিম ল’জ’ (ডব্লিউএলইউএমএল)-এর সহযোগিতায় এই অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শা-ই-আলম। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুধু জ্ঞান উৎপাদন নয়; ক্যাম্পাসে ও অনলাইনে নিরাপদ, শ্রদ্ধাশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে তোলাও তাদের প্রশাসনিক ও সামাজিক দায়িত্ব। অনুষ্ঠানে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সৈয়দ আজিজুল হক উপস্থিত ছিলেন।

আন্তর্জাতিক বক্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কনকর্ডিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এমেরিটা ও ডব্লিউএলইউএমএলের প্রতিষ্ঠাতা হোমা হুদফার, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রভাষক ও ডব্লিউএলইউএমএলের নির্বাহী বোর্ড সদস্য মোনা তাজালি, কার্লটন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক সামার ফরেস্টার এবং কনকর্ডিয়া ইউনিভার্সিটির অ্যাফিলিয়েট সহকারী অধ্যাপক আফরা জালাবি। আলোচনা প্রক্রিয়াটি সঞ্চালনা করেন এসএমইউসিটির ইংরেজি বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক মো. শাহরিয়ার তালুকদার। এ ছাড়া ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বক্তারা এতে অংশ নেন এবং এসএমইউসিটির বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত থেকে নিজস্ব মতামত উপস্থাপন করেন।

আলোচনায় দেশি-বিদেশি বক্তারা পারিবারিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও রাজনৈতিক ভীতিপ্রদর্শনসহ সহিংসতার নানা রূপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁরা উল্লেখ করেন, সামাজিক কলঙ্ক, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং ন্যায়বিচারে সীমিত প্রবেশাধিকারের কারণে বহু ভুক্তভোগী সঠিক আইনি প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রাজনীতি, ব্যবসা, শিক্ষা ও সরকারি সেবায় নারীদের পিছিয়ে থাকার পেছনে অবৈতনিক গৃহশ্রম, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, সম্পদে অসম প্রবেশাধিকার এবং সমাজে প্রোথিত গৎবাঁধা মানসিকতাকে দায়ী করা হয়।

গোলটেবিল বৈঠকের একটি উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে ছিল জুলাই বিপ্লবে রাজপথে নামা নারীদের ভূমিকা ও বর্তমান পরিস্থিতি। বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাহসের প্রতীক হিসেবে প্রশংসিত হওয়ার পর তাঁদের অনেকে এখন সামাজিক মাধ্যমে চরম অপপ্রচার, ডক্সিং, নৈতিক পাহারাদারি, হুমকি ও বিকৃত ছবি প্রচারের মাধ্যমে অনলাইন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। তাঁদের মতে, এসব আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য হলো নারীদের কণ্ঠরোধ করা, অন্যদের জনজীবনে আসতে নিরুৎসাহিত করা এবং আন্দোলনে নারীদের ঐতিহাসিক অবদানকে মুছে ফেলা। সমাপনী বক্তব্যে মো. শাহরিয়ার তালুকদার বলেন, জুলাই বিপ্লব একদিকে যেমন নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অভূতপূর্ব শক্তি প্রদর্শন করেছে, অন্যদিকে এর পরবর্তী অনলাইন ও সামাজিক ঝুঁকিকেও সামনে এনেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, একাডেমিক ফোরাম জীবনাভিজ্ঞতাকে গভীর গবেষণায় এবং গবেষণাকে এমন কার্যকর ধারণায় রূপ দিতে পারে, যা সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিতে বাস্তবে প্রয়োগ করা সম্ভব।

অংশগ্রহণকারীরা ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক শক্তিশালী আইনি ও অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা জোরদার করা, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল কনটেন্ট মডারেশন নিশ্চিত করা, শৈশব থেকে জেন্ডার-সংবেদনশীল শিক্ষার প্রসার, রাজনীতিতে নারীর অধিক প্রতিনিধিত্ব এবং পুরুষ ও ছেলেদের ইতিবাচক মিত্র হিসেবে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের গোপনীয়তা ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের অধিকার পূর্ণ রক্ষা করে নৈতিকভাবে যেকোনো সহিংসতার ঘটনা নথিবদ্ধ করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

আলোচকরা ঐকমত্য পোষণ করেন যে নারীর প্রতি সহিংসতা এবং তাঁদের অগ্রগতির পথের বাধা কেবল জাতীয় সীমানার ভেতরে আবদ্ধ নয়। তাই স্থানীয় পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত হতে হবে। অনুষ্ঠানটি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। সমাপনীতে বক্তারা অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, নারী যতদিন ভয়হীনভাবে রাস্তায় হাঁটতে, স্বাধীনভাবে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে এবং অনলাইনে নিঃসঙ্কোচে মতামত প্রকাশ করতে না পারছেন, ততদিন প্রকৃত গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার অসম্পূর্ণ থাকবে। এই লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন আয়োজকরা।

এআইএল/সকালবেলা