লাখাইয়ের তরুণ কবি ইয়াহিয়া আহমেদ
পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে কবিতায় সমাজ ও জীবনের গল্প
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২৮ অপরাহ্ণ
মোঃ শরীফ উদ্দিন: লাখাই উপজেলার তরুণ কবি ইয়াহিয়া আহমেদ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। বর্তমানে তিনি আর পড়াশোনা করেন না; ব্যবসার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে তিনি অসংখ্য গল্প ও কবিতা লিখেছেন।
তরুণ এই কবির লেখায় প্রেম, বিরহ, অভিমান, প্রকৃতি, মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের পাশাপাশি সমাজের নানা অসঙ্গতি ও শোষণের চিত্র ফুটে ওঠে। সহজ ভাষায় জীবন ও সমাজের নানা বিষয়কে তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি।
ইয়াহিয়া আহমেদের ‘মেঘ, পাহাড়, ও নদী’ কবিতায় মেঘ, নদী, সাগর ও পাহাড়কে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, অভিমান এবং জীবনের পরিবর্তনশীল সম্পর্কের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে ‘আরেকটা মহাজনী মেলা’ কবিতায় ব্যঙ্গাত্মকভাবে সমাজের কথিত ক্ষমতাবান ও শোষক শ্রেণির অনৈতিক কর্মকাণ্ড, অর্থের প্রভাব, দুর্নীতি ও সামাজিক ভণ্ডামির চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন অষ্টম শ্রেণিতে থেমে গেলেও সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ থেমে যায়নি। নিজের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও চারপাশের সমাজকে পর্যবেক্ষণ করে তিনি নিয়মিত কবিতা ও গল্প লিখে যাচ্ছেন। ব্যবসার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় রয়েছে তাঁর।
নিচে তরুণ কবি ইয়াহিয়া আহমেদের দুটি কবিতা তুলে ধরা হলো—
মেঘ, পাহাড়, ও নদী
কবি: ইয়াহিয়া আহমেদ
এক ছিল মেঘ,
আরেক ছিল নদী—
মেঘ আর নদীর মধ্যে
চমৎকার ভাব।
নদীটির ছিল অনেক কষ্ট,
মেঘ সবসময়
মুছে দিত নদীর কান্না।
কিন্তু নদী—
সে কেবল ঝরিয়েছিল
মেঘের চোখের বন্যা,
সেই মেঘের নোনা জলে
স্নান করত নদী।
একদিন মেঘ
খুব অভিমানী হয়ে
নদীটিকে শুধাল—
“কেন আমায়
বারবার কান্নার স্রোতে ভাসাও?”
নদী মৃদু হেসে বলল—
“ভালোবাসি বলে।”
নদীর সেই মিঠে উত্তরে
মেঘ সবকিছু ভুলে গেল,
খুশিতে আত্মহারা হয়ে
কেমন অমল-ধবল
হয়ে উঠল সে।
কিন্তু—
কালক্রমে দৃশ্য বদলে গেল।
মেঘ দেখল,
নদীর সমস্ত হৃদয়জুড়ে
সাগরের রাজত্ব।
নদীর সঙ্গে সাগরের
বেশ জম্পেশ চলছে।
মেঘের জল
নদী নির্দ্বিধায়
সাগরের বক্ষস্তলে
ঢেলে দিতে থাকল,
সাগরও তা গ্রহণ করল
অবলীলায়।
কিন্তু মেঘ?
মেঘের জীবনে নেমে এলো
অন্ধকার বিষাদের শ্রাবণ।
মেঘের চোখে
অবিরাম ঝরে বর্ষণ,
কণ্ঠে ছিল বজ্রপাত
অথচ নদীর সেদিকে
ছিল না কোনো নেত্রপাত।
নদীর ভালোবাসায়
মেঘ হয়ে গিয়েছিল
ভাসমান শেওলা।
তখন যেন নদী
সেই শেওলাকে
সোনার প্রলেপ ভাবত।
অথচ সেই নদীই আজ
ভাসমান শেওলাকে
অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল ভেবে
দূরে ঠেলে দিয়েছে।
অতঃপর—
নদী মেঘকে একলা ফেলে
সাগরের বুকে পাড়ি জমাল।
তারপর সাগর?
তার সমীকরণ ছিল অন্য।
তার উত্তাল,
হুরমুরে ঢেউ
শক্ত আঘাতে
নদীকে থামিয়ে দিল।
নদী হতবাক—
সাগরের সেই বিষম সমীকরণ
মেলাতে পারল না দিশেহারা নদী।
ভালোবাসলে মানুষ
হয়ে যায় বোকা,
আর ভালোবাসা হারালে
হয়ে যায় উন্মাদ।
নদী দিশেহারা হৃদয় নিয়ে
আবার ওপরে
মেঘের পানে চাইল।
কিন্তু ততদিনে—
বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
ততদিনে মেঘ
ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে,
অভিমান করে
অনেক দূর পাড়ি জমিয়েছে।
এখন আর সে
বর্ষণ ঝরায় না।
বর্ষার সব মেঘ ঝরিয়ে
সে এখন
চৈত্রের খরতপ্ত রোদের মতো
শক্ত ও কঠিন।
সেখানে আর
কোনো শ্রাবণ ঝরে না।
এখন সে নদী থেকে
অনেক দূরে—
বহুদূরে।
এক সবুজে ঘেরা
শান্ত পাহাড়ের রাজ্যে
মেঘ গিয়ে থেমেছে।
পাহাড়ের সঙ্গে
আজকাল মেঘের বেশ ভাব।
মেঘ ক্লান্ত হলে
পাহাড় তার বিশাল বক্ষ
পেতে দেয়,
মুছে দেয় মেঘের
সকল বিষাদ,
সমস্ত ক্লান্তি।
আর ওদিকে—
নদীকে ঢেউয়ের মায়াজালে
বন্দী করে রেখেছে সাগর।
সাগর তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে
উপহাসের হাসি হাসে—
কিলবিল করে।
আর দূর পাহাড়ের বুকে
মেঘ আজ নিশ্চুপ।
তার চোখে আর বর্ষণ নেই,
কণ্ঠে নেই বজ্রপাত।
শুধু পাহাড়ের বুকে
মাথা রেখে
নিশ্চুপ গভীর নিদ্রায় তলিয়েছে।
---
মহাজনী মেলা
কবি: ইয়াহিয়া আহমেদ
(একটি কাল্পনিক শোষক চক্রের জবানবন্দি)
আমাদের আছে অঢেল ক্যাশ, সমাজ বলে লোকগুলো বেশ,
তাদের কাছে থাকি আমরা সর্বদা বিশেষ।
রাইতে আমরা মাদক বেচি, দিনের বেলা হজরত সাজি,
নৈতিকতার ঝুলি খুলে বিলাই উপদেশ,
অথচ খাচ্ছি ক্রমশ লুটেপুটে দেশ।
সমাজ সাফাই নাম দিয়ে ঐ চুনোপুঁটির গায়ে,
চুরির দায়ে শৃঙ্খলে বাঁধি, জেল খাটাই যে ধায়ে।
অথচ আমরাই অঢেল কৃষ্ণবিত্ত দূর মুলুকে পাচার করি,
মুখ খুললে কেউ পিঠের চামড়া, কণ্ঠের ছাদ চেপে ধরি।
আমরা কৃষ্ণ বিত্ত ধবল করতে গড়লাম মহাজনী মেলা,
বিষের ঘরে সুচতুর সুখে, করি মানবের জীবন নিয়ে খেলা।
নজর দিলে কেউ আসিয়া, নিব তার লোচন কাড়িয়া,
আমরাই তো এই ভূখণ্ডের মহাবলীয়ান!
পরের বিত্ত আমাদের পকেটে, ভূমির কপি আমাদেরই নিকটে,
আপত্তি জানালে আমাদের প্রকটে, সে যে পড়বে বিশাল সংকটে।
হ্যাঁ, ধরা যদি পড়ে যাই আইনের জালে, আরেকজন ঢুকে যায় নাটকের ছলে।
আইনের ফাঁক গলে যায়, টাকা ওড়ে হাটে,
টাকার জোরে শোষক এসে খেলা শেষ কাটে!
হ্যাঁ আমরা ভণ্ড, আমাদের নেই কোনো নৈতিক বোধ,
তবুও সমাজ বলে, তারা ফেরেশতা, তারা ভগবান, তারা ভালো লোক।
হ্যাঁ আমরা মুখে বলি ভালোবাসি প্রিয় দেশ,
অথচ সুযোগ পেলে খেয়ে ফেলি লুটেপুটে দেশ।
|