নতুন পে-স্কেলে ইনক্রিমেন্ট ও বাড়ি ভাড়ায় বড় রদবদল

প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৩ পূর্বাহ্ণ
নতুন পে-স্কেলে ইনক্রিমেন্ট ও বাড়ি ভাড়ায় বড় রদবদল
বাংলাদেশ সরকার

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ঘোষিত নতুন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট (বেতন বৃদ্ধি) ও বিভিন্ন ভাতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, গ্রেড-২০ থেকে গ্রেড-৬ পর্যন্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট সুবিধা পেলেও উচ্চতর গ্রেডগুলোতে এই হার ধাপে ধাপে হ্রাস পাবে।

বিদ্যমান বেতন কাঠামোয় সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অভিন্ন হারে মূল বেতনের ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট পেয়ে থাকেন। তবে নতুন খসড়া প্রস্তাবনায় গ্রেড-৫-এ ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ শতাংশ, গ্রেড-৪ ও গ্রেড-৩-এ ৩.৫ শতাংশ এবং গ্রেড-২-এ তা কমিয়ে ২.৭৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মূল বেতন অঙ্কে বেশি হলেও শতাংশের হিসেবে তাঁদের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার তুলনামূলক কমবে। সামরিক বাহিনীতেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করে ক্যাপ্টেন ও সমপদ পর্যন্ত ৫ শতাংশ, মেজরে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেলে ৩.৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে ২.৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া নতুন স্কেল কার্যকরের সাথে সাথে ২০২৪ সালে চালু হওয়া বিশেষ প্রণোদনা বাতিল হবে।

এর আগে গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ‘জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬’ এবং সামরিক বাহিনীর জন্য ‘যৌথ বাহিনী নির্দেশাবলি-২০২৬’ অনুমোদন পায়। কার্যবিবরণী অনুযায়ী, নতুন কাঠামোতেও বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল থাকছে। সর্বনিম্ন গ্রেড-২০-এর প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেড-১-এর নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আর্থিক শৃঙ্খলার বিষয়টি মাথায় রেখে নতুন এই স্কেল একবারে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হবে।

বাড়ি ভাড়ার শতাংশে পরিবর্তন নতুন পে-স্কেলে বাড়ি ভাড়ার শতকরা হার কিছুটা কমানোর প্রস্তাব এসেছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বর্তমানে গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ বাড়ি ভাড়া দেওয়া হলেও নতুন নিয়মে তা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করা হচ্ছে। অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভারে তা ৪০–৫৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০–৫০ শতাংশ এবং এর বাইরের এলাকায় ৩৫–৫০ শতাংশের স্থলে ২৫–৪৫ শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। তবে কর্মকর্তাদের মূল বেতন দ্বিগুণের বেশি বাড়ায় শতাংশ কমলেও দিনশেষে নগদ ভাতার মোট পরিমাণ বাড়বে বলে জানিয়েছে অর্থ বিভাগ।

৮ বছরে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পদোন্নতি বঞ্চিতদের জন্য উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির সময়সীমা শিথিল করা হয়েছে। আগে একই পদে পদোন্নতি ছাড়া ১০ বছর চাকরি করলে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া যেত, নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ৮ বছর করা হচ্ছে। দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পেতে একই পদে আরও ৬ বছর চাকরি করতে হবে (চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার)। তবে পদোন্নতির সুযোগহীন ‘ব্লকড পদ’-এর কর্মচারীরা যথাক্রমে ৮, ৬ এবং পরবর্তী ৮ বছর চাকরির পর জীবনে মোট তিনবার এ সুবিধা পাবেন।

চিকিৎসা ও মোবাইল ভাতায় সুবিধা বর্তমানে সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। নতুন নিয়মে ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সীদের জন্য এই ভাতা বাড়িয়ে ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের জন্য ৪ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সীরা মাসে ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীরা ৬ হাজার টাকা করে চিকিৎসা ভাতা পাবেন।

প্রথমবারের মতো সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য চালু হচ্ছে মোবাইল ভাতা। প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা মাসে ৫০০ টাকা এবং ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা প্রতি মাসে ১৫০ টাকা করে মোবাইল ভাতা পাবেন।

অন্যান্য ভাতা ও সশস্ত্র বাহিনী অন্যান্য সুবিধাদির মধ্যে যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হচ্ছে। তবে বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামানো হয়েছে। পাহাড়ি ও হাওড়-দ্বীপ ভাতা ২০ শতাংশ বহাল থাকলেও একটি সর্বোচ্চ সীমা থাকবে। সশস্ত্র বাহিনীর এনসি (ই) পদের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২১ হাজার এবং মেজর জেনারেলদের ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণসহ সামরিক বিভিন্ন ঝুঁকি ও প্রযুক্তিগত ভাতার পরিমাণ ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ২৪ লাখ সামরিক-বেসামরিক কর্মরত সদস্য এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত পেনশনভোগী প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও মূল আর্থিক সমন্বয়গুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে।

মন্তব্য করুন