১১ বছরে লিটনের ‘প্রথম’ ফিফটি

প্রকাশ: রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০৪:২৪ অপরাহ্ণ
১১ বছরে লিটনের  ‘প্রথম’ ফিফটি

ক্রীড়া প্রতিবেদক:ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম এক রোমাঞ্চকর ও আবেগঘন মহাকাব্যের সাক্ষী হলো মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ২০১৫ সালে এই ঐতিহাসিক মাঠেই ভারতের বিপক্ষে ওডিআই ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল লিটন কুমার দাসের। সেদিন মাত্র ৮ রান করে ফিরে যাওয়া লিটন গত ১১ বছরে জাতীয় দলের জার্সিতে অসংখ্য স্মরণীয় ও ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলেছেন, দেশের বাইরে একাধিক সেঞ্চুরিও করেছেন। কিন্তু ওডিআই ফরম্যাটে মিরপুরের শেরে বাংলা স্টেডিয়াম যেন বারবারই তাঁকে আটকে রেখেছিল এক অদৃশ্য ও অলক্ষ্য দেয়ালে। অবশেষে আজ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওডিআই ম্যাচে কেটে গেছে সেই দীর্ঘ ১১ বছরের আক্ষেপের খরা।

আজ রবিবার (১৪ জুন) বিকেলে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট, বিসিবি ও ওডিআই সিরিজ খতিয়ান’ এবং ‘ম্যাচ অ্যানালাইসিস, পিচ কন্ডিশন ও প্লেয়ারস পারফরম্যান্স ট্র্যাকিং উইং’-এর বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে লিটনের ঐতিহাসিক কামব্যাক ও ক্রিকেটীয় পরিসংখ্যানের খতিয়ান বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

ম্যাচের কন্ডিশন ও গেমপ্ল্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ দল যখন ৬১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে তীব্র ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, তখন তরুণ তাওহীদ হৃদয়কে সাথে নিয়ে ইনিংস মেরামতের প্রধান দায়িত্ব নেন লিটন। দুজনে মিলে স্কোরবোর্ডে ৯২ রানের এক অনবদ্য পার্টনারশিপ যোগ করার মাঝেই ব্যক্তিগত ৪৮ রানে পায়ের পেশিতে তীব্র টান (Cramp) লাগায় রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন লিটন। সে সময় পুরো স্টেডিয়াম ও কোটি ভক্ত আশঙ্কায় পড়েছিলেন যে লিটন বোধহয় আজকেও ফিফটির দোরগোড়া থেকে ট্র্যাজিক হিরো হয়ে ফিরলেন।

তবে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে ইনিংসের শেষ দিকে দলের চরম প্রয়োজনে আবারও গ্লাভস হাতে ক্রিজে ব্যাট করতে নামেন এই উইকেটকিপার ব্যাটার। ইনিংসের ৪৯তম ওভারের শেষ বলে স্কয়ার লেগের দিকে ঠেলে দিয়ে দ্রুত ২ রান নেওয়ার সাথে সাথেই মিরপুরের আকাশের দিকে ব্যাট উঁচিয়ে বহু প্রতীক্ষিত অর্ধশতকের মাইলফলক স্পর্শ করেন লিটন দাস। শেষ পর্যন্ত ৫৮ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন তিনি। এটি মিরপুরে লিটনের প্রথম ওডিআই ফিফটি তো বটেই, পাশাপাশি শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও তাঁর ওডিআই ক্যারিয়ারের প্রথম হাফ-সেঞ্চুরি।

হোম অব ক্রিকেটে ওডিআই ফরম্যাটে লিটন দাসের পূর্ববর্তী পরিসংখ্যান খতিয়ান ছিল বিস্ময়কর রকমের হতাশাজনক। এই ম্যাচের আগে শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মোট ২৮টি ওডিআই ইনিংস খেলেও কোনো ফিফটির মুখ দেখতে পারেননি তিনি। চলতি সিরিজের প্রথম ম্যাচ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই মাঠে তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল মাত্র ১৭-এর সামান্য উপরে (৪৩৯ রান)। এছাড়া মিরপুরের চেনা পিচে ৪ বার শূন্য রানে (ডাক) আউট হওয়ার এক অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডও ছিল তাঁর ঝুলিতে।

এমনকি আন্তর্জাতিক ওডিআই ক্যারিয়ারে প্রায় ৮৫ স্ট্রাইক রেটে ব্যাটিং করা এই ড্যাশিং ওপেনার মিরপুরের উইকেটে ৭০ স্ট্রাইক রেটও স্পর্শ করতে পারতেন না। কিন্তু আজ অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে সব নেতিবাচক সমীকরণ ও সমালোচনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ৭৪ স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করে অপরাজিত ৫৮ রানের এক মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন লিটন।

সাম্প্রতিক সময়েও মিরপুরের মাটিতে বারবার ব্যাটের গতি হারিয়ে আক্ষেপে পুড়তে হয়েছে লিটনকে। ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত বিগত পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ড সিরিজে তিনটি ওডিআই ইনিংসে চল্লিশোর্ধ্ব রান করলেও শেষ পর্যন্ত ফিফটির মেথড স্পর্শ করতে পারেননি তিনি। ফলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আজকের এই লড়াকু অর্ধশতক শুধু তাঁর ব্যক্তিগত খতিয়ানের এক বিশাল অর্জনই নয়, বরং দীর্ঘদিনের এক অপূর্ণতার অবসান। লিটন ও হৃদয়ের গড়া সেই মজবুত ভিত্তির ওপর ভর করেই বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫০ ওভারে ২৭৪ রানের লড়াকু পুঁজি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। বিসিবি ও ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, লিটনের এই ফর্ম ও মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর মেথডলজি আসন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশ দলকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন