রামেবি ক্যাম্পাসে প্রায় ২০ কোটি টাকার স্থাপনার হদিস নেই

প্রকাশ: রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ০২:১৮ অপরাহ্ণ
রামেবি ক্যাম্পাসে প্রায় ২০ কোটি টাকার স্থাপনার হদিস নেই
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি

আবু কাওসার মাখন, রাজশাহী ব্যুরো: রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা প্রায় ১৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা মূল্যের স্থাপনা, সীমানা প্রাচীর, নলকূপ ও অন্যান্য অবকাঠামোর সিংহভাগের কোনো হদিস মিলছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাবে এত বিপুল অঙ্কের সম্পদের বিপরীতে নিলাম বাবদ জমা পড়েছে মাত্র ২০ লাখ ৪১ হাজার টাকা। ফলে বাকি প্রায় ১৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা মূল্যের সরকারি সম্পদ যথাযথ নিয়ম মেনে নিলাম না করে অপসারণ বা লুটপাটের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২৩ সালে রাজশাহী নগরের সিলিন্দা মৌজায় ৬৭ দশমিক ৬৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে রামেবি কর্তৃপক্ষ। জমির ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি সেখানে থাকা পাকা, আধাপাকা ও টিনশেড ভবন, দীর্ঘ সীমানা প্রাচীর, নলকূপ, গভীর নলকূপ, সাবমারসিবল পাম্প এবং গাছপালার বিপরীতে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রায় ১৯ কোটি ৬৭ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৮ টাকা পরিশোধ করা হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বহিরাগত একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট চক্র এসব মূল্যবান স্থাপনা ও অবকাঠামো অপসারণের সাথে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর অবকাঠামো ভাঙা ও মালামাল সরানোর তৎপরতা আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

এর আগে ওই একই ক্যাম্পাসের প্রায় ২৫ হাজার গাছের মধ্যে মাত্র ২ হাজার ৬৪২টি গাছ নিলামে বিক্রির তথ্য প্রকাশ পেয়েছিল। বাদ পড়া প্রায় ৮ হাজার গাছের কোনো সঠিক হিসাব না পাওয়ায় স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন। এবার ভবন ও অবকাঠামো গায়েবের ঘটনায় নতুন করে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।

নথি অনুযায়ী, জমি অধিগ্রহণকৃত এলাকায় দুটি তিনতলা, ছয়টি দোতলা, তিনটি একতলা এবং একটি নির্মাণাধীন দোতলা ভবনসহ মোট ১২টি সুসংগঠিত পাকা ভবন ছিল। এছাড়া সাতটি আধাপাকা ও টিনশেড ঘর, ১টি ইটনির্মিত দোকান, ৩টি ছাদের শেড, প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ৩৬টি সীমানা প্রাচীর, বেশ কয়েকটি গভীর নলকূপ ও ১০টি সাবমারসিবল পাম্প ছিল। সরেজমিনে পরিদর্শনে বর্তমানে এসবের কোনোটিরই চিহ্ন দেখা যায়নি।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত বছরের ৯ জুলাই একটি নামমাত্র নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। সেই বিজ্ঞপ্তিতে মাত্র কয়েকটি ভবন ও একটি দোকান ঘর বিক্রির কথা উল্লেখ ছিল। পরবর্তীতে এনআরবিসি ব্যাংকের ১০টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে রামেবির অর্থ ও হিসাব বিভাগে মাত্র ২০ লাখ ৪১ হাজার টাকা জমা পড়ে। বাকি কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো কীভাবে সরিয়ে ফেলা হলো, তার কোনো অফিসিয়াল রেকর্ড নেই।

বর্তমান পরিস্থিতি যাচাই করতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তৃত ক্যাম্পাস এলাকায় একটি জরাজীর্ণ দোতলা ভবন ছাড়া আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। বর্তমানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বালু ফেলে ভূমি ভরাটের কাজ পরিচালনা করছে। কর্মরত শ্রমিকরা জানান, তারা যখন কাজ শুরু করেন, তখন সেখানে কোনো সীমানা প্রাচীর কিংবা পাকা ভবনের অবশিষ্টাংশ ছিল না; ভূমি ভরাটের আগেই সবকিছু কেটে ও ভেঙে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হক উপাচার্য এবং ক্যাম্পাস নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দ্বৈত দায়িত্ব নেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি ভূমি উন্নয়ন ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। স্থানীয়দের দাবি, তার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ব্যাপক হারে অবকাঠামো সরাতে তৎপর হয়ে ওঠে অসাধু চক্রটি।

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ও সুনির্দিষ্ট বক্তব্য জানতে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জাওয়াদুল হকের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন পরিচালক নজিবুর রহমান নিজের দায় এড়িয়ে বলেন, “আমি মাত্র আট মাস আগে পদে যোগদান করেছি, তাই পেছনের ঘটনাগুলো আমার জানা নেই। তবে অধিগ্রহণের সময় সরকারি নিয়ম অনুযায়ী যে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়, পুরোনো মালামাল নিলামের সময় সেই সমপরিমাণ অর্থ ওঠে না। সে কারণেই হয়ত ২০ কোটি টাকা মূল্যের নির্ধারিত স্থাপনা ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকতে পারে। এটি আমার ব্যক্তিগত ধারণা মাত্র।”

মন্তব্য করুন