৩০ সেকেন্ডের যে অভ্যাসে মুড ভালো হতে পারে

প্রকাশ: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০৪ অপরাহ্ণ
৩০ সেকেন্ডের যে অভ্যাসে মুড ভালো হতে পারে

জীবনযাপন ডেস্ক: দৈনন্দিন জীবনের দৌড়ঝাঁপ, কাজের চাপ আর চারপাশের দুশ্চিন্তায় নিজেকে প্রায়শই ক্লান্ত ও দিশেহারা মনে হয়। আর এই মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতে আমরা অনেকেই মেডিটেশন কিংবা দীর্ঘ শরীরচর্চার কথা ভাবি  আপনি যদি নিজেকে খুব চাপের মধ্যে বা উদ্বেগে আচ্ছন্ন অনুভব করেন, তাহলে সুস্থতা বা মানসিক প্রশান্তি বাড়ানোর জন্য ছোট ও সহজ কিছু 'মাইক্রোপ্র্যাকটিস' করার কথা ভাবতে পারেন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় গবেষকরা জানিয়েছেন, মন ভালো রাখতে ও মেজাজ প্রফুল্ল করতে সব সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দেওয়াই জরুরি নয়  পাঁচ মিনিটের মেডিটেশন সেশন থেকে শুরু করে শীতের বরফঠান্ডা পানিতে সাঁতার- নিজের যত্ন নেওয়ার এমন আধুনিক অনেক পদ্ধতিই বেশ সময়সাপেক্ষ হতে পারে। কিন্তু এখন অনেক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, এর জন্য সবসময় এত বেশি সময় দেওয়ার দরকার নেই।

‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’ বইয়ের লেখক এলি সাসম্যান ও নেদারল্যান্ডসের ডেলফ্ট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক ন্যাটালি ভ্যান ডের ওয়ালের মতে, প্রতিদিন মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ছোট ছোট অনুশীলনেই মনের ভাব বা 'মুড' আমূল বদলে ফেলা সম্ভব 'মাইক্রোপ্রাকটিস' বইয়ের লেখক এলি সাসম্যানের মতে, কিছু অনুশীলন করতে মাত্র ৩০ সেকেন্ড সময় ব্যয় হতে পারে। এগুলোকে বলা হয় 'মাইক্রোপ্র্যাকটিস' বা ক্ষুদ্র অনুশীলন। বিজ্ঞানসম্মত এমন চারটি সহজ ‘মাইক্রোপ্র্যাকটিস’ বা ক্ষুদ্র অভ্যাস তুলে ধরা হলো

১. লাফটার ইয়োগা (ইচ্ছাকৃত হাসি)

কোনো কৌতুক বা মজার ঘটনা ছাড়াই কৃত্রিমভাবে হাসির অনুশীলন শুরু করাই লাফটার ইয়োগার মূল বিষয়  লাফটার ইয়োগার মূল বিষয় হলো কোনো কৌতুক বা মজার ঘটনা ছাড়াই ইচ্ছাকৃতভাবে হাসি শুরু করা। গবেষণায় দেখা গেছে, জোর করে হাসতে শুরু করলেও কয়েক সেকেন্ডের মাথায় তা সত্যিকারের হাসিতে পরিণত হয় [cite: ভ্যান ডের ওয়াল বলেছেন, "কিছুক্ষণ পর অনেক সময় এই কৃত্রিম হাসিটাই সত্যিকারের হাসিতে পরিণত হয়"। এমনকি মেটা-অ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ কৌতুকের হাসির চেয়ে এমন সচেতন হাসি বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ দূর করতে দ্বিগুণ কার্যকরী  ভ্যান ডের ওয়াল একটি বড় মেটা-অ্যানালাইসিস দেখেছি যে কৌতুক ছাড়া হাসি বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ কমাতে কৌতুক বা হাস্যরসের সঙ্গে সম্পর্কিত হাসির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ কার্যকর।]।

কীভাবে করবেন: পেটের ওপর হাত রেখে তিনবার গভীর শ্বাস নিয়ে কৃত্রিমভাবে ‘হি হি হি, হা হা হা’ শব্দে হাসতে থাকুন  প্রথমে তিনবার গভীর শ্বাস নিন এবং পেটের ওপর হাত রাখুন। এরপর ইচ্ছে করে হাসতে শুরু করুন। যদি সরাসরি হাসতে অস্বস্তি লাগে, তাহলে প্রথমে বলুন- "হি হি হি, হা হা হা"। ধীরে ধীরে হাসির মাত্রা বাড়ান এবং শেষে একটি গভীর শ্বাস নিয়ে নিজের কৃতজ্ঞতার বিষয়গুলো স্মরণ করুন ধীরে ধীরে হাসির শব্দের ভলিউম বাড়াতে থাকুন. শেষে আবার একটি গভীর শ্বাস নিন এবং আপনি যে বিষয়গুলোর জন্য কৃতজ্ঞ, সেগুলোর बात ভাবুন।]।

২. মাইক্রো ইয়োগা (শরীর প্রসারিত করা)

যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ল্যাপটপ বা ফোনের স্ক্রিনের সামনে ঝুঁক কুঁকড়ে বসে কাজ করেন, তাদের জন্য এটি বেশ কার্যকর  এই ব্যায়ামটি বিশেষ করে তাদের জন্য খুব দরকারি যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের সামনে বসে থাকেন। স্ক্রিনে টানা বসে থাকার শারীরিক প্রভাব দূর করার পাশাপাশি প্রতি ১৫ মিনিটে মাত্র ১৫-৩০ সেকেন্ড শরীর স্ট্রেচ করলে কাজের দক্ষতা প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়ে যায় একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতি ১৫ মিনিট পর পর মাত্র ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের জন্য শরীর প্রসারিত বা স্ট্রেচ করলে কাজের দক্ষতা প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

কীভাবে করবেন: পিঠের পেছনে আঙুলগুলো একে অপরের সাথে ইন্টারলক করুন  আপনার পিঠের পেছনে দুই হাতের আঙুলগুলো একে অপরের সাথে ইন্টারলক করুন বা জড়িয়ে ধরুন)। শ্বাস নেওয়ার সময় হাত দুটি নিচের দিকে প্রসারিত করে বুক হালকা ওপরের দিকে তুলুন : এরপর শ্বাস নেওয়ার (ইনহেল) সাথে সাথে আপনার হাত দুটি নিচের দিকে প্রসারিত করুন এবং বুকটা আলতো করে উপরের দিকে তুলুন। শ্বাস ছাড়ার সাথে সাথে শরীর শিথিল করুন এবার শ্বাস ছাড়ার (এক্সহেল) সাথে সাথে শরীরকে শিথিল করে স্ট্রেচ বা প্রসারণের গভীরতা অনুভব করুন।

৩. স্লো ব্রিদিং (ধীরগতির শ্বাস-প্রশ্বাস)

উদ্বেগ বা মানসিক চাপ অনুভব করার মুহূর্তে ধীরগতির শ্বাস নেওয়া আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে তাৎক্ষণিক শান্ত করে  আপনি যদি মানসিক চাপে থাকেন বা কিছুটা উদ্বেগে যান তাহলে শ্বাস-প্রশ্বাসের অভ্যাস স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করতে সাহায্য করে]। এটি প্যারাসিমপ্যাথেটিক স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে তোলে। গবেষণায় প্রমাণিত, মাত্র তিনটি দীর্ঘ ও ধীরগতির শ্বাস মস্তিষ্কে 'আলফা তরঙ্গ' বাড়িয়ে দেয়, যা মনে গভীর শিথিলতা তৈরি করে সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় একদল গবেষক দেখেছেন যে, মাত্র তিনটি ধীর ও দীর্ঘ শ্বাস নিলে তা মস্তিষ্কের 'আলফা তরঙ্গ' বাড়িয়ে দেয়... একই সাথে এটি 'থিটা তরঙ্গ' বাড়ায়, যা গভীর শিথিলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

কীভাবে করবেন: চোখ বন্ধ করে আরাম করে বসুন। মোট ১০ সেকেন্ড সময় নিয়ে তিনটি ধীর ও গভীর শ্বাস নিন, যেখানে শ্বাস ছাড়ার সময়টি শ্বাস নেওয়ার চেয়ে দীর্ঘ হবে  প্রায় ১০ সেকেন্ড সময় নিয়ে মোট তিনটি ধীর ও গভীর শ্বাস নিন, যেখানে শ্বাস ছাড়ার সময়টি শ্বাস নেওয়ার সময়ের চেয়ে দীর্ঘ হবে।]।

৪. আত্ম-সহানুভূতিশীল স্পর্শ (Self-Compassionate Touch)

বুকের ওপর নিজের হাত রেখে নিজের প্রতি একটু সহমর্মিতা প্রকাশ করলেও শরীর ও মন দ্রুত শান্ত হয়  মাত্র ২০ সেকেন্ডের একটি সহজ 'নিজেকে শান্ত করার স্পর্শ' অনুশীলনের মাধ্যমেও আমরা দীর্ঘস্থায়ী সুফল পেতে পারি। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০ সেকেন্ডের জন্য হাত দুটি বুকে বা বাহুতে রেখে নিজের প্রতি সদয় চিন্তা করলে স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে  গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীরা যখন নিজেদের প্রতি সদয় চিন্তাভাবনা করার পাশাপাশি তাদের হাত বুক ও পেটের ওপর রেখেছিলেন, তখন তাদের শরীরে স্ট্রেস হরমোন 'কর্টিসল'-এর মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল।

কীভাবে করবেন: নিজের এক বা দুটি হাত বুকের ওপর অথবা বাহুতে আলতো করে রাখুন। গভীর শ্বাস নিয়ে নিজের প্রতি ইতিবাচক চিন্তা করুন এবং হাতের মৃদু স্পর্শ ও ওমের ওপর মনোযোগ দিন  একটি গভীর শ্বাস নিন এবং নিজের প্রতি সদয় চিন্তাভাবনা করার সাথে সাথে আপনার হাতের উষ্ণতা ও মৃদু চাপের অনুভূতির ওপর মনোযোগ দিন।

গবেষকদের পরামর্শ হলো, সব পদ্ধতি একসাথে করার দরকার নেই। প্রাত্যহিক জীবনের সাথে আপনার যেটি সবচেয়ে বেশি মানিয়ে যায়, সেটি বেছে নিয়ে অনুশীলন করলেই মিলবে অনাবিল প্রশান্তি বরং আপনার জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই কোনো একটি উপায় খুঁজে নেওয়াই যথেষ্ট।

মন্তব্য করুন