প্লাস্টিক দানবের কবলে গাজীপুর

প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০১ অপরাহ্ণ
প্লাস্টিক দানবের কবলে গাজীপুর

রেজাউল করিম মজুমদার (গাজীপুর): গাজীপুর জেলার তুরাগ, লবলং ও চিলাই নদীসহ অভ্যন্তরীণ প্রায় ১৬১টি পয়েন্ট এখন তীব্র প্লাস্টিক ও শিল্প বর্জ্যের দূষণে বিপর্যস্ত, যা এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দেশের অন্যতম প্রধান এই শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন উৎপাদিত টন টন কঠিন বর্জ্যের একটি বিশাল অংশই হলো একবার ব্যবহারযোগ্য বা 'সিঙ্গেল-ইউজ' প্লাস্টিক। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠনের সাম্প্রতিক তথ্য ও প্রমাণ বলছে, প্লাস্টিক ব্যবহারের এই আগ্রাসন যদি এখনই আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসের মাধ্যমে রুখে দেওয়া না যায়, তবে গাজীপুরের মাটি ও জলাশয়গুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ্যা হয়ে পড়বে।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এবং এর আশেপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি বড় ঘাটতি রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গাজীপুরের লবলং নদী প্লাস্টিক কারখানা এবং অন্তত ১৫টি মিউনিসিপ্যাল বর্জ্য লাইনের কারণে মারাত্মকভাবে ভরাট হয়ে গেছে। তুরাগ নদীর তলদেশে প্লাস্টিক ও পলিথিনের আস্তরণ এতটাই পুরু যে স্বাভাবিক জলজ উদ্ভিদ ও দেশীয় মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে।

প্লাস্টিক প্রাকৃতিকভাবে পচে না। এটি ভেঙে অত্যন্ত ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হচ্ছে, যা গাজীপুরের কৃষিজমি এবং মাছের পেটে প্রবেশ করে পুরো খাদ্যশৃঙ্খল বিষাক্ত করে তুলছে।

চান্দনা চৌরাস্তা, বোর্ডবাজার কিংবা টঙ্গীর মতো জনাকীর্ণ এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই কৃত্রিম বন্যা বা জলাবদ্ধতা সৃষ্টির মূল কারণ ড্রেনগুলোতে আটকে থাকা প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিন ব্যাগ।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম (৫২) আক্ষেপ করে বলেন, "আজ থেকে বিশ বছর আগেও আমরা বাজারে যাওয়ার সময় চটের ব্যাগ বা কাপড়ের থলি সাথে নিতাম। এখন কাঁচাবাজারে গেলে ছোট একটা মরিচ কিনলেও বিক্রেতা প্লাস্টিকের পলিথিনে ভরে দেয়। আমরাও অলস হয়ে গেছি, ব্যাগ সাথে নিই না। এই পলিথিনগুলো বাড়ি এনে ডাস্টবিনে ফেলি, আর সেগুলো ড্রেনে গিয়ে আটকে থাকে। মশা বাড়ে, দুর্গন্ধে থাকা যায় না। আমাদের নিজেদের এই অভ্যাস না বদলালে গাজীপুরকে বাঁচানো যাবে না।"

পরিবেশ বিজ্ঞানী ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গবেষক ড. সায়মা আক্তার বলেন, "সরকার সম্প্রতি প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উৎপাদকদের ওপর কঠোর নির্দেশিকা জারি করেছে এবং সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক নিষিদ্ধের আইন এনেছে। তবে কেবল আইন দিয়ে গাজীপুরের মতো বিশাল জনসংখ্যা ও শিল্পঘন এলাকা পরিচ্ছন্ন করা অসম্ভব। প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রায় ৯৬% সরাসরি প্রকৃতিতে অপসারিত হয়। নাগরিকেরা যদি উৎসস্থলে বাড়ি থেকেই পচনশীল বর্জ্য ও প্লাস্টিক বর্জ্য আলাদা না করেন, তবে রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া সফল হবে না। আমাদের ছোট ছোট ব্যক্তিগত পরিবর্তনই এখানে বড় হাতিয়ার।"

আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় সামান্য কিছু পরিবর্তন গাজীপুরের পরিবেশকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। যেমন— বাজারে যাওয়ার সময় সাথে করে পাটের বা কাপড়ের ব্যাগ বহন করা। দোকানদারের দেওয়া পলিথিন ব্যাগ সরাসরি বর্জন করা। প্লাস্টিকের ওয়ান-টাইম জলের বোতল কেনা বন্ধ করে ধাতব বা কাঁচের পুনঃব্যবহারযোগ্য বোতল সাথে রাখা। ঘরের প্লাস্টিকের কৌটা, বোতল বা প্যাকেটগুলো সাধারণ রান্নাঘরের বর্জ্যের সাথে না মিশিয়ে আলাদা করে ভাঙারি বিক্রেতা বা রিসাইক্লিং চ্যানেলে দেওয়া। প্লাস্টিকের ফাইল বা ফোল্ডারের পরিবর্তে কাগজের ফাইল এবং প্লাস্টিকের কাপ-প্লেটের বদলে মাটির বা কাঁচের তৈজসপত্র ব্যবহার করা।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তবে সরকারি ও করপোরেট উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের 'প্লাস্টিককে না বলা'র মানসিকতাই পারে তুরাগ ও লবলং নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং গাজীপুরকে একটি সবুজ, বাসযোগ্য নগরী হিসেবে টিকিয়ে রাখতে।

এআইএল/সকালবেলা