পাঁচ শতাব্দীর ঐতিহ্য কটিয়াদীর ঢাকের হাট

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪৩ অপরাহ্ণ
পাঁচ শতাব্দীর ঐতিহ্য কটিয়াদীর ঢাকের হাট

নূর আহাম্মদ পলাশ (কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি): শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে পাঁচ শতাব্দীর ঐতিহ্য ধরে রেখে আজও প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকের হাট’। ঢাক, ঢোল, কাঁসর, করতাল, সানাই ও বাঁশির মনমুগ্ধকর সুরে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে কটিয়াদী পৌর এলাকার পুরাতন বাজার প্রাঙ্গণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা নিজেদের বাদ্যের নৈপুণ্য প্রদর্শন করছেন, আর তাঁদের পরিবেশনা শুনে পছন্দসই বাদ্যদল বুকিং দিচ্ছেন দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির প্রতিনিধিরা।

প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, ষোড়শ শতকে স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় চৌধুরীর দুর্গাপূজার রাজকীয় আয়োজনকে কেন্দ্র করে ঐতিহ্যবাহী এই হাটের সূচনা হয়। তৎকালীন রাজপ্রাসাদে পূজামণ্ডপে বাদ্য পরিবেশনের জন্য বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকিদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। তাঁদের বাদ্যের তাল শুনে বিচার-বিশ্লেষণ করে সেরা দলটি নির্বাচন করা হতো। কালক্রমে শত বছরের সেই আয়োজনই একটি স্বাতন্ত্র্যময় ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাটে রূপ নেয়।

নাম ‘ঢাকের হাট’ হলেও মূলত এখানে বাদ্যযন্ত্র কেনাবেচা হয় না। দুর্গোৎসবের দিনগুলোতে মণ্ডপে বাদ্য পরিবেশনের জন্য ঢাকিদের সাথে পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে চুক্তি নিশ্চিত করেন আয়োজকেরা। মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কুমিল্লাসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজারও শিল্পী নিজেদের পারদর্শিতা দেখিয়ে পূজা উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করার প্রতিযোগিতায় নামেন।

ঐতিহ্যবাহী এ ঢাকের হাট সরেজমিনে পরিদর্শন করে এর অবকাঠামোগত উন্নয়নে একাধিক পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছেন কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দীন। তিনি বলেন, কটিয়াদীর এই হাট পাঁচ শতাধিক বছরের লোকজ ঐতিহ্য বহন করে আসছে। সারাদেশে দুর্গোৎসবে ঢাক-ঢোলের গুরুত্ব বিবেচনায় এই হাটের তাৎপর্য অপরিসীম।

পরিদর্শনকালে তিনি জানান, হাটে আসা শিল্পীদের অস্থায়ী অবস্থানের স্বার্থে প্রয়োজনীয় শৌচাগার, অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের রাস্তা ও বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করার জোর দাবি রয়েছে। এসব সংকট নিরসনে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শৌচাগার নির্মাণের জন্য ইতিপূর্বে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাটের সড়ক সোলিং এবং সাবমার্সিবল ওয়াটার পাম্প স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে আগামী বছর থেকে বাদ্যশিল্পীদের ভোগান্তি লাঘব হবে। এ সময় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সনাতন ধর্মাবলম্বী প্রতিনিধি ও কটিয়াদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উপস্থিত ছিলেন।

মূলত আধুনিক সাউন্ড সিস্টেমের বিস্তার ঘটলেও পূজামণ্ডপে সনাতন বাদ্যযন্ত্রের আবেদন আজও চিরন্তন। কটিয়াদীর ঢাকের হাট কেবল আর্থিক চুক্তির স্থান নয়; এটি বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, পেশাগত ঐতিহ্য ও অনন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক মহামিলনমেলা।

এআইএল/সকালবেলা