জেলে থাকা আসামিদের কললিস্ট নিয়ে দুর্ধর্ষ প্রতারণা

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৯ অপরাহ্ণ
জেলে থাকা আসামিদের কললিস্ট নিয়ে দুর্ধর্ষ প্রতারণা

মোহাম্মদ সোহেল রানা (চট্টগ্রাম): দুর্ধর্ষ প্রতারণার এক অভিনব কৌশল নিয়ে মাঠে সক্রিয় একটি চক্র। কখনো জেল সুপার (জেলার), কখনো জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, কখনো আবার পুলিশ অফিসার কিংবা আইনজীবী—পরিচয়ে নানা সরকারি পদের ছদ্মবেশ ধারণ করে এরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ধর্ষ প্রতারণা করে আসছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কোতোয়ালী থানার একটি মামলায় (নং-৫০, তারিখ: ৩০/১২/২০২৫ খ্রি:) মহানগর ডিবি দক্ষিণ পুলিশের চৌকস অফিসার সাব-ইন্সপেক্টর নজরুল অত্যন্ত বিচক্ষণতা, কঠোর পরিশ্রম ও মেধা কাজে লাগিয়ে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে এই দুর্ধর্ষ প্রতারক চক্রের মূল হোতা মো. তোরাব ওরফে রেজাউল করিম ওরফে মামুনকে (৪৩) গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় আরও সাতটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

তদন্তে জানা যায়, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় জেলখানায় বন্দি আসামিদের সঙ্গে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে আত্মীয়-স্বজনের কথা বলার সরকারি ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত সুকৌশলে সেই সুযোগের অপbeginning বা অপব্যবহার করছে একটি দুর্ধর্ষ প্রতারক চক্র। জেলখানার অভ্যন্তর থেকে বন্দিদের কল রেকর্ড বা যোগাযোগের তালিকা গোপনে সংগ্রহ করে তা কারারক্ষীদের মাধ্যমে কারাগারের সুরক্ষিত গণ্ডি পেরিয়ে বাইরে থাকা দুর্ধর্ষ প্রতারক চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হতো।

এরপর সেই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন মোবাইল নম্বর থেকে কারারক্ষী কিংবা কারাগারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিচয়ে বন্দিদের স্বজনদের ফোন করতেন। ফোন করে তারা বন্দিদের আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে চরম ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেন। প্রতারকরা বলত, “আমি চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় জেলখানা থেকে বলছি। জেলখানায় থাকা আপনার আত্মীয় অন্য এক আসামির সঙ্গে মারামারি করে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এখন আপনার বন্দি আত্মীয়কে ডান্ডাবেড়ি পরানো হয়েছে এবং দ্রুত অন্য কোনো জেলার জেলখানায় স্থানান্তরসহ নতুন মামলা দেওয়া হবে।”

স্বাভাবিকভাবেই জেলখানা ও বন্দি প্রিয়জনের এমন বিপদের খবর শুনে স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ঠিক এই দুর্বলতার সুযোগটিকেই কাজে লাগাত দুর্ধর্ষ প্রতারক চক্র। বন্দিকে মামলা ও ডান্ডাবেড়ি থেকে বাঁচানোর লোভ দেখিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং বা বিকাশের মাধ্যমে ২০ হাজার থেকে শুরু করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, এভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া অবৈধ অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ চলে যেত কারাগারের অভ্যন্তরে থাকা দায়িত্বশীল সেই অসাধু কারারক্ষী বা টেলিফোন কলের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পকেটে।

বিশিষ্টজনদের মতে, জেলখানার অভ্যন্তরে বন্দিদের টেলিফোন আলাপ ও কল লিস্ট ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এটি সরাসরি কারা কর্তৃপক্ষের নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কারারক্ষীদের নজরদারিতে পরিচালিত হয়। নিয়ম অনুযায়ী এই স্পর্শকাতর তথ্যগুলো কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সংরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও, তা কারারক্ষীদের মাধ্যমে বাইরে চলে যাওয়ার এবং এর বিনিময়ে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি গোটা কারা ব্যবস্থাপনাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

বিশ্লেষকদের অভিমত, জেলখানার ভেতরে বন্দিদের যোগাযোগের মাধ্যম ও কল লিস্ট তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক নজরদারি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের অভাব না থাকলে এ ধরনের গোপনীয় তথ্য কোনোভাবেই বাইরে পাচার হওয়ার সুযোগ ছিল না। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অসাধু কর্মকর্তাদের এই স্তরের উদাসীনতা ও অপরাধের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা চক্রটিকে এমন অপরাধ সংঘটনের সুযোগ করে দিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক অনুসন্ধান বলছে, জেলখানায় বন্দিদের কথা বলার বুথ এবং কল লিস্ট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদের কার্যক্রম ও ভূমিকা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে জেলখানার অভ্যন্তরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়াসহ বড় ধরনের নাশকতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায়।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে রিমান্ডে এনে চক্রের মূল শেকড় এবং জেলখানার অভ্যন্তরের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কারারক্ষী ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশের বিষয়টি উন্মোচনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ ও অভিযান চালানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ রক্ষায় এবং জেলখানার অভ্যন্তরের শৃঙ্খলা ফেরাতে দায়িত্বে অবহেলাকারী ও এই চক্রের সাথে জড়িত প্রতিটি অসাধু কারারক্ষীকে কঠোর আইনের আওতায় আনার দাবি জোরালো হচ্ছে।

এআইএল/সকালবেলা