দুবাইয়ে প্রবাসীর ৯৬ লাখ টাকা চুরি: ভাগ নেওয়ার অভিযোগে ইউপি চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার

প্রকাশ: রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৩ অপরাহ্ণ
দুবাইয়ে প্রবাসীর ৯৬ লাখ টাকা চুরি: ভাগ নেওয়ার অভিযোগে ইউপি চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার
কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশিদনগর ইউনিয়ন পরিষদ ভবন এবং গ্রেপ্তারকৃত ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আলমের ফাইল ছবি।

ইমতিয়াজ মাহমুদ ইমন, কক্সবাজার: মধ্যপ্রাচ্যের দেশ দুবাইয়ে এক প্রবাসী বাংলাদেশির ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ক্যাশ ড্রয়ার ভেঙে ৯৬ লাখ ৩২ হাজার টাকা চুরির ঘটনায় দেশীয় যোগসাজশের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। ওই চুরির ঘটনায় আত্মসাৎ করা অর্থের একটি বড় অংশ আর্থিক সুবিধা বা ভাগ হিসেবে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশিদনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) বিতর্কিত চেয়ারম্যান শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ ও তদন্তকারী সূত্রের দাবি, চাঞ্চল্যকর এই চুরির মামলার এজাহারনামীয় এক আসামির আদালতে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে চেয়ারম্যান শাহ আলমের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতার তথ্য বেরিয়ে আসে।

গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) বিকেলে রামুর জেঠিরাস্তা এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে পুলিশের একটি বিশেষ যৌথ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।

মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দুবাইয়ে প্রবাসীর দোকান থেকে টাকা চুরির এই ঘটনায় গত ১ অক্টোবর ভুক্তভোগী প্রবাসী সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে কক্সবাজারের চকরিয়া থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। বাদী সাইফুল ইসলাম জেলার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের খরুলিয়া সিকদারপাড়ার বাসিন্দা।

উক্ত মামলায় দোকানের বিশ্বস্ত কর্মচারী মো. নোমানকে প্রধান আসামি করা হয়। এ ছাড়া মিলি আক্তার, উম্মে কুলছুম, রমিজুর রহমান তুহিন, মীর আহমদ ও জাহানারা আরজুসহ অজ্ঞাতনামা আরও দুই-তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।

বাদী প্রবাসীর অভিযোগ অনুযায়ী, সাইফুল দুবাইয়ে দীর্ঘদিন ধরে বোরকার ব্যবসা করে আসছেন। প্রধান অভিযুক্ত নোমান তাঁর দোকানে কর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পূর্বপরিচিত হওয়ার সুবাদে নোমানকে অত্যন্ত বিশ্বাস করতেন সাইফুল এবং তাঁরা দুজনেই দুবাইয়ে একই মেস বা কক্ষে বসবাস করতেন। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন বিক্রির বিপুল পরিমাণ অর্থ সাইফুল শয়নকক্ষের একটি ক্যাশ ড্রয়ারে তালাবদ্ধ করে রাখতেন। নির্দিষ্ট সময় পর সেই টাকা দিয়ে মালামাল ক্রয় কিংবা ব্যাংকে জমা দেওয়া হতো। ড্রয়ারের চাবি সব সময় প্রবাসীর নিজের কাছেই থাকত, তবে টাকা কোথায় রাখা হয় তা কর্মচারী নোমানেরও ভালো জানা ছিল।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে বাদী উল্লেখ করেন, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল আটটার দিকে ব্যক্তিগত শারীরিক ব্যায়ামের জন্য জিমে যাওয়ার সময় অসাবধানতাবশত ক্যাশ ড্রয়ারের চাবি বিছানার বালিশের নিচে রেখেই ঘর থেকে বের হন সাইফুল। তখন কক্ষের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন নোমান। এরপর সকাল ১০টার দিকে রুমে ফিরে সাইফুল দেখতে পান শয়নকক্ষের বিছানাপত্র, তোশক ও জামাকাপড় চরমভাবে এলোমেলো এবং কক্ষে নোমানের কোনো অস্তিত্ব নেই। সন্দেহ হওয়ায় বালিশের নিচ থেকে চাবি নিয়ে ড্রয়ার খুলে দেখেন সেখানে থাকা সমস্ত দিরহাম উধাও। তাৎক্ষণিকভাবে নোমানের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে আর পাওয়া যায়নি। এমনকি দুবাইয়ে প্রবাসী অন্যান্য পরিচিতজনদের জানিয়েও নোমানের কোনো সন্ধান মেলেনি।

এদিকে ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ ইতোমধ্যে অভিযান চালিয়ে মামলার এজাহারভুক্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং তাঁদের কাছ থেকে লুটের টাকার মধ্য থেকে নগদ ২২ লাখ ৭৩ হাজার টাকা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও চকরিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইসমাইল জানান, “গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের গভীরে গিয়ে দেখা যায়, এই টাকা স্থানান্তর এবং বান্দরবান-কক্সবাজার চক্রের মাধ্যমে আত্মসাতের ঘটনায় ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আলম সরাসরি জড়িত। বিশেষ করে মামলার তিন নম্বর আসামি উম্মে কুলছুমের সুনির্দিষ্ট স্বীকারোক্তিতে ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আলমের নাম অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে আসে।”

পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে উম্মে কুলছুম দাবি করেন, দুবাই থেকে হুন্ডি ও বিভিন্ন মাধ্যমে পাঠানো বা আত্মসাৎকৃত সেই বিশাল অংকের টাকা থেকে ইউপি চেয়ারম্যান শাহ আলম ব্যক্তিগতভাবে নগদ ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা ভাগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এই তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পরই পুলিশ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করেছে।

জনপ্রতিনিধি গ্রেপ্তারের পর প্রশাসনিক পদক্ষেপে বিষয়ে জানতে চাইলে রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান জানান, “তিনি রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কাছ থেকে চেয়ারম্যান আটকের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জেনেছেন। আইন অনুযায়ী একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের সাময়িক অনুপস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক ও দৈনন্দিন কার্যক্রম স্বচ্ছতার সাথে পরিচালনা এবং পরবর্তী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন জেলা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে খুব দ্রুতই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”