বর্ষায় পানিবন্দি খালিয়াজুরী: অপরূপ প্রকৃতির আড়ালে অবহেলিত এক জনপদ

বর্ষায় পানিবন্দি খালিয়াজুরী: অপরূপ প্রকৃতির আড়ালে অবহেলিত এক জনপদ

মহসিন মিয়া, নেত্রকোনা প্রতিনিধি: বর্ষা এলেই হাওড়বেষ্টিত নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলাটি যেন পানির বুকে ভেসে ওঠে। দূর থেকে গ্রামগুলোকে মনে হয় পদ্মপাতার মতো একেকটি ভাসমান দ্বীপ। নয়নাভিরাম এই দৃশ্য পর্যটকের চোখ জুড়ালেও এর আড়ালে লুকিয়ে আছে লক্ষাধিক মানুষের নিত্যদিনের বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম। চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবিকার অনিশ্চয়তা নিয়ে বছরের একটি বড় সময় মানবেতর জীবনযাপন করতে হয় এই দুর্গম জনপদের বাসিন্দাদের।

প্রায় ৩০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের খালিয়াজুরীতে বসবাস করছে লক্ষাধিক মানুষ। জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে থাকে। জেলা সদরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ায় এই সময়ে নৌযানই একমাত্র ভরসা। তবে বৈরী আবহাওয়ায় উত্তাল হাওড় পাড়ি দেওয়া জীবনের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে এখানকার স্বাস্থ্যসেবায়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তীব্র সংকট রয়েছে। বর্তমানে ৯টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে ৫টিই শূন্য এবং বিশেষজ্ঞ পদের ৪টির সবকটিই খালি। নেই কোনো সিজারিয়ান বা উন্নত অস্ত্রোপচারের সুবিধা। গুরুতর রোগীদের জেলা সদরে পাঠানোর পথে অনেক সময় রোগীর মৃত্যু ঘটে, যা এখানকার মানুষের নিত্যদিনের ট্র্যাজেডি।

হাওড়াঞ্চলের ৬৩টি সরকারি প্রাথমিক ও ১৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বর্ষাকালে নিয়মিত ক্লাসে যেতে পারে না। নৌকায় যাতায়াত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। দারিদ্র্য ও যোগাযোগ সংকটে এখানে প্রাথমিক শিক্ষার হার মাত্র ৩৭.৩৯% এবং মাধ্যমিকের হার ৩৪%, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক কম।

এখানকার অর্থনীতি মূলত এক ফসলি বোরো ধান ও মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীল। অকাল বন্যা বা বাঁধ ভাঙলে কৃষকের শত শত কোটি টাকার ফসল তলিয়ে যায়। পাশাপাশি জলমহাল ইজারা নিয়ে অনিয়মের কারণে সাধারণ জেলেরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

 উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদির হোসেন শামীম জানান, খালিয়াজুরীর ভৌগোলিক বাস্তবতা মাথায় রেখে টেকসই সড়ক ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ জরুরি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি—কেবল আশ্বাস নয়, জেলা সদরের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা পেলেই এই জনপদ সত্যিকারের মুক্তির স্বাদ পাবে।

মন্তব্য করুন