সমবায় অধিদপ্তর: অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে গতিশীল রূপান্তর ও দক্ষ নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি

আমিরুল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ০৩:২১ অপরাহ্ণ
সমবায় অধিদপ্তর: অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথে গতিশীল রূপান্তর ও দক্ষ নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি
অনক আলী হোসেন শাহিদী: 
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও তৃণমূলভিত্তিক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি হলো সমবায় অধিদপ্তর, যা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের মাধ্যমে পরিচালিত। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদারে এই অধিদপ্তরের ভূমিকা ক্রমেই আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সমবায় অধিদপ্তরের কার্যক্রমের মূলভিত্তি হলো সমবায় সমিতির নিবন্ধন, নিরীক্ষা, তদারকি, আইন বাস্তবায়ন, প্রশিক্ষণ এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রম। সর্বশেষ নীতিমালার আলোকে নতুন সমবায় গঠন ও নিবন্ধনের মাধ্যমে সংগঠিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। একইসঙ্গে নিয়মিত অডিট, পরিদর্শন ও তদারকির মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হচ্ছে, যা সমবায় ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করছে।
আইনগত কাঠামোর সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমবায় সমিতির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা অধিদপ্তরের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে সমবায় সদস্য ও কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে, যা তাদের উৎপাদনশীলতা ও উদ্যোক্তা সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করছে।
সমবায়ভিত্তিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে মূলধন গঠন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম এবং প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে সদস্যদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনা হচ্ছে। একইসঙ্গে সমবায় সমিতির নির্বাচন তদারকি এবং গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়নে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।
বর্তমানে “সমবায় মডেল গ্রাম পাইলট প্রকল্প” (২০২১-২০২৬) গ্রামীণ উন্নয়নের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মাধ্যমে গ্রাম পর্যায়ে সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন, বিপণন ও সেবা কাঠামো গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চলছে। পাশাপাশি দুগ্ধ সমবায় সম্প্রসারণ, আইসিটি ও সিটিজেন সার্ভিস উন্নয়ন প্রকল্প অধিদপ্তরের সেবাকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলছে।
অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প- যেমন সমবায় একাডেমির আধুনিকায়ন, সমন্বিত গ্রাম উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, শিক্ষিত বেকারদের উদ্যোক্তা সৃষ্টি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দক্ষতা ও ভাষা প্রশিক্ষণ- সমবায় খাতকে একটি বহুমাত্রিক উন্নয়ন প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে। কৃষিপণ্যের ভ্যালু চেইন উন্নয়নের উদ্যোগ উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে সহায়তা করবে।
এই বিস্তৃত কার্যক্রমের তত্ত্বাবধানে রয়েছে দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্ব, যা নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করছে।
২০২৬ সালের ১৬ মার্চ নিবন্ধক ও মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মোঃ সেলিম ফকির সমবায় অধিদপ্তরের কার্যক্রমে একটি নতুন গতিশীলতা নিয়ে এসেছেন। তার বহুমাত্রিক প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং ফলাফলভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অধিদপ্তরের কর্মপরিধি ও কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে ইতোমধ্যেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নিবন্ধক ও মহাপরিচালক মোঃ সেলিম ফকির বলেন, “সমবায় শুধু একটি অর্থনৈতিক কাঠামো নয়, এটি একটি সামাজিক শক্তি। আমরা সমবায়কে আধুনিক, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে কাজ করছি, যাতে তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ সরাসরি উপকৃত হয়। আমাদের লক্ষ্য হলো- সমবায়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র‍্য হ্রাস এবং টেকসই উন্নয়নের একটি কার্যকর মডেল গড়ে তোলা।”
তার এই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক সংস্কার, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে সমবায় অধিদপ্তর একটি আধুনিক ও জনমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পথে অগ্রসর হচ্ছে।
তবে কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান- যেমন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব এবং বাজারসংযোগের ঘাটতি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ নেতৃত্ব, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, সমবায় অধিদপ্তর বর্তমানে একটি রূপান্তরমুখী পর্যায় অতিক্রম করছে। দক্ষ নেতৃত্ব, সুসংগঠিত পরিকল্পনা এবং বাস্তবমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে দেশের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যার কেন্দ্রে থাকবে জনগণের অংশগ্রহণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক অগ্রগতি।

মন্তব্য করুন