হাওরে বিপর্যয় মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে সরকার

আমিরুল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ০৩:২৫ অপরাহ্ণ
হাওরে বিপর্যয় মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে সরকার
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অঞ্চল প্রতি বছরই প্রাকৃতিক বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেও ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে আকস্মিক ভারী বর্ষণ ও অকাল বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা ও আশপাশের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মাঝে গভীর উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক সংকট সৃষ্টি হয়। মাঠ পর্যায়ের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী লক্ষাধিক কৃষক পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়েছে, যা স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্রুত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন, যা সরকারের মানবিক ও দায়িত্বশীল অবস্থানের একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ঘোষণাটি শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষি পুনর্গঠন কাঠামোর সূচনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করে আগামী তিন মাস তাদের জন্য সরকারি সহায়তা প্রদান করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগেই জেলা প্রশাসনকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এতে বোঝা যায় যে সরকার এখন শুধু দুর্যোগ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া নয়, বরং আগাম প্রস্তুতি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
হাওরাঞ্চলের কৃষি কাঠামো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং একমাত্র ফসলনির্ভর। এখানে প্রধান ফসল বোরো ধান, যার ওপর কৃষকের সারাবছরের অর্থনৈতিক নির্ভরতা গড়ে ওঠে। দেশের মোট বোরো উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই অঞ্চল থেকে আসে। ফলে এই ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কৃষকের আয়, খাদ্য নিরাপত্তা, ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা একযোগে ব্যাহত হয়।
এখানে জলবায়ুগত বৃহৎ প্রভাবক হিসেবে এল নিনো ও লা নিনা-এর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক ২০২৪–২০২৬ সময়কালে এল নিনোর প্রভাবে খরা, তাপপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ঘাটতি দেখা দেয়, যা মাটির আর্দ্রতা কমিয়ে দেয় এবং সেচ খরচ বাড়িয়ে উৎপাদন ব্যাহত করে। পরবর্তী সময়ে লা নিনার প্রভাবে অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণে এপ্রিল-মে মাসে আগাম বন্যা দেখা দেয়, যা ফসল কাটার সময়েই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে।
এই দ্বৈত জলবায়ু প্রভাব হাওর কৃষিকে একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। একদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে ফসল সম্পূর্ণ ধ্বংস—এই দুই চাপ কৃষকদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
২০২৬ সালের পরিস্থিতি বিশেষভাবে সংকটপূর্ণ। বছরের শুরুতে শুষ্ক আবহাওয়া ও বৃষ্টির ঘাটতির কারণে ধানের প্রাথমিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। কৃষকরা অতিরিক্ত সেচে বাধ্য হন, ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এরপর এপ্রিল মাসে হঠাৎ অতিবৃষ্টি ও ঢল নেমে আসায় পাকা ধান সম্পূর্ণভাবে পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে একই মৌসুমে কৃষকরা দ্বিগুণ ক্ষতির মুখে পড়েন—উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং ফসল হারানো।
এই পরিস্থিতিতে কৃষকের ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়ে। সরাসরি ফসল ক্ষতি ছাড়াও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, ঋণগ্রস্ততা, কর্মসংস্থান সংকট এবং গ্রামীণ অর্থনীতির দুর্বলতা দেখা দেয়। ফলে এটি এখন একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ঘোষিত তিন মাসের সহায়তা কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য খাদ্য সহায়তা, নগদ অর্থ সহায়তা এবং কৃষি পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এটি কেবল জরুরি ত্রাণ নয়, বরং একটি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
এই সহায়তার মাধ্যমে কৃষকরা তাৎক্ষণিক খাদ্য সংকট থেকে মুক্তি পাবেন এবং পরবর্তী মৌসুমে পুনরায় চাষাবাদে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি প্রশাসনিক পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে, যাতে প্রকৃত কৃষকরাই সহায়তা পান।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সহায়তা ব্যবস্থার সম্ভাব্য কাঠামো। কৃষকদের জন্য সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে কয়েকটি ধাপে। প্রথমত, পরিবারভিত্তিক খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল, ডাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে যাতে দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সহায়তা পৌঁছে যায়। তৃতীয়ত, কৃষি পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে উন্নত বীজ, সার ও প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ ভর্তুকি মূল্যে বা বিনামূল্যে সরবরাহ করা যেতে পারে। চতুর্থত, কৃষিঋণ পুনর্গঠন, সুদ মওকুফ বা কিস্তি পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে আর্থিক চাপ কমানো যেতে পারে। পঞ্চমত, খাল খনন, বাঁধ মেরামত এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে সাময়িক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যেতে পারে। এই বহুমাত্রিক সহায়তা কাঠামো বাস্তবায়িত হলে কৃষক শুধু ত্রাণই পাবেন না, বরং পুনরায় উৎপাদনে ফিরে আসার সক্ষমতাও অর্জন করবেন।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সহায়তা ও কৃষি পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে কিছু বাস্তবভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে। প্রথমত, স্বল্পমেয়াদি ও জলবায়ু সহনশীল ধান জাতের সম্প্রসারণ জরুরি, যাতে আগাম বন্যার ঝুঁকি কমে। দ্বিতীয়ত, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বাড়িয়ে দ্রুত ফসল কাটা নিশ্চিত করা গেলে ক্ষতির মাত্রা কমানো সম্ভব। তৃতীয়ত, উন্নত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও ডিজিটাল আবহাওয়া মনিটরিং চালু করা প্রয়োজন, যাতে কৃষকরা সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। চতুর্থত, কৃষকদের বিকল্প আয়ের উৎস যেমন মাছ চাষ, হাঁস পালন ও জলজ কৃষি সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। পঞ্চমত, কৃষি প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ সেবা জোরদার করে আধুনিক প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। ষষ্ঠত, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে একটি হাওর কৃষি অভিযোজন কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কৃষি উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
হাওরাঞ্চলের সাম্প্রতিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া এবং জাতীয় লক্ষমাত্রা ঠিক রাখার জন্য আউশ ধানের আবাদ সারাদেশব্যাপী সম্প্রসারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে ফসলহানির পর জমি দীর্ঘ সময় অনাবাদি না রেখে, যে-সব এলাকায় আউশধান আবাদ করা সম্ভব, সে-সব এলাকায় আউশ ধানের চাষ বৃদ্ধি করা গেলে জাতীয় পর্যায়ে আংশিক আয় পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে এবং খাদ্য উৎপাদন ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। এ লক্ষ্যে আউশ ধানের আবাদি এলাকা বাড়ানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর মধ্যে উন্নত ও স্বল্পমেয়াদি আউশ জাতের ধান সরবরাহ, প্রয়োজনীয় বীজ ও কৃষি উপকরণ ভর্তুকি প্রদান, এবং কৃষকদের জন্য মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সেচ সুবিধা ও পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটালে আউশ ধানের উৎপাদন ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। আউশ ধানের আবাদ সম্প্রসারণ শুধু ফসল বৈচিত্র্যই বাড়াবে না, বরং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষিকে আরও সহনশীল ও টেকসই ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে সহায়তা করবে।
হাওরাঞ্চলের কৃষি পুনর্গঠনে Bangladesh Rice Research Institute (ব্রি), Bangladesh Agricultural Research Institute (বারি) এবং Bangladesh Fisheries Research Institute (বিএফআরআই)-এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি, উন্নত জাত উদ্ভাবন এবং মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও World Food Programme-এর মতো সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা ও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনে।
হাওরাঞ্চলের সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য। স্বল্পমেয়াদে জরুরি সহায়তা, মধ্যমেয়াদে উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
জাতীয় অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকেও হাওরাঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের খাদ্য উৎপাদনের বড় অংশ এই অঞ্চল থেকে আসে। তাই এই অঞ্চলের কৃষকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সর্বোপরি, হাওরাঞ্চলের এই সংকটময় সময়ে সরকারের তিন মাসের সহায়তা ঘোষণা একটি সময়োপযোগী ও মানবিক পদক্ষেপ। তারেক রহমান এর এই উদ্যোগ কৃষকদের মাঝে আস্থা ও নিরাপত্তা সৃষ্টি করবে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে অভিযোজনমূলক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয়।

লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং প্রকল্প পরিচালক
এলএসটিডি প্রকল্প
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

মন্তব্য করুন