রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২৯,৬০০ কোটি টাকার বিশাল দুর্নীতি ও অডিট আপত্তি
বিশেষ প্রতিবেদক: বহুল আলোচিত বালিশ-কাণ্ডকেও ছাড়িয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে এবার বেরিয়ে এসেছে নজিরবিহীন ও অকল্পনীয় আর্থিক অনিয়মের চিত্র। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তরের (ফাপাড) বিশেষ নিরীক্ষা এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিদর্শন প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত ৯ বছরে প্রকল্পের প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকা খরচের বিপরীতে উঠে এসেছে ২৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ মূল্যের বিশাল অডিট আপত্তি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পটিতে সর্বমোট ২৩০টি অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু প্রথম পাঁচ অর্থবছরেই ৪১ হাজার ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ের বিপরীতে অনিয়ম ধরা পড়ে ৮ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে, যেখানে ১৬ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা খরচের বিপরীতে ফাপাড একাই ১৫ হাজার ২০৭ কোটি টাকার গুরুতর অডিট আপত্তি উত্থাপন করেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আর্থিক ক্ষতির সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীদের জন্য নির্মিত ‘গ্রিন সিটি’ আবাসন প্রকল্প। মোট ২৩০টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১২০টিই উঠেছে এই আবাসনকে কেন্দ্র করে। সরকারি দরপত্রের আড়ালে অস্বাভাবিক মূল্যে কেনাকাটা দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
অনিয়মের এক চরম দৃষ্টান্তে দেখা যায়, গ্রিন সিটির ১১টি ভবনের জন্য বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটর ক্রয়ে সরকারি প্রাক্কলিত মূল্য ছিল প্রায় ২৭ কোটি টাকা। অথচ একই সরঞ্জাম কেনার অজুহাতে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা! অর্থাৎ স্রেফ একটি আইটেমেই সরকারের পকেট থেকে অতিরিক্ত খসেছে ১৮৭ কোটি টাকা। একইভাবে, একটি নির্দিষ্ট ভবনের ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকার সরঞ্জাম ক্রয়ে বিল প্রদান করা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
বিশেষ নিরীক্ষায় তুলে ধরা হয় যে, ইতোপূর্বে ঝড় তোলা ‘বালিশ-কাণ্ড’ ছিল এই মহা-অনিয়মের কেবল ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র। প্রকল্পে ৪ হাজার ৭০২টি বালিশের মধ্যে ৬০টির প্রতিটির দর হাঁকা হয়েছিল ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা। ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকার বালিশ ৫ কোটি ৪১ লাখ টাকায় কিনে ৩ কোটি ৯২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতিসাধন করা হয়েছিল। তবে ফাপাডের নতুন প্রতিবেদন বলছে, গ্রিন সিটির ২০টি ভবনের কেনাকাটা ও নির্মাণকাজ পর্যালোচনা করেই তাঁরা অন্তত ২৯৫ কোটি টাকার সুনির্দিষ্ট ও অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতির প্রমাণ পেয়েছেন।
আর্থিক লুটপাটের পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদ ও অগ্রগতি নিয়েও চরম অবহেলা বজায় রেখেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিটের এ প্রকল্পের কাজ ২০১৬ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন করা হয়েছে। আইএমইডি জানিয়েছে, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট’ ২০১২ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো হালনাগাদ বার্ষিক কর্মপরিকল্পনাই জমা দেয়নি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিষয়টিকে পতনের পূর্বে গড়ে ওঠা ‘চোরতন্ত্রের’ চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, "রাশিয়া বৈশ্বিক দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ অবস্থানে। প্রকল্প তদারকিতে আপাদমস্তক যোগসাজশের এই অপশাসন লাঘবে প্রতিটি অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা জরুরি।"
সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ বলেন, "পিপিএ ও পিপিআর কঠোরভাবে পরিপালন না করা এবং প্রকল্প তদারকি স্টিয়ারিং কমিটির চরম অবহেলার কারণেই আজ ২৯ হাজার কোটি টাকার বেশি অডিট আপত্তি তৈরি হয়েছে। অনুমোদনকারী কোনো কর্তাই এর দায় এড়াতে পারেন না।
|