পারফেক্ট’ সম্পর্কের ভান ভেঙে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘গবলিনটিমেসি’

প্রকাশ: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩০ অপরাহ্ণ
পারফেক্ট’ সম্পর্কের ভান ভেঙে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘গবলিনটিমেসি’

জীবনযাপন ডেস্ক:প্রেম কিংবা ডেটিংয়ের শুরুতে সঙ্গী বা সঙ্গিনীর মন জয় করতে নিজেকে যতটা সম্ভব নিখুঁত ও আকর্ষণীয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টাটা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। নিজের ছোটখাটো অপূর্ণতা, অদ্ভুত সব অভ্যাস কিংবা মানসিক দুর্বলতাগুলো লুকিয়ে রেখে নিজেকে একদম ‘পারফেক্ট’ মানুষ হিসেবে জাহির করার ঝোঁক প্রায় সবার মধ্যেই দেখা যায়। তবে সময়ের সাথে সাথে বদলাচ্ছে ভালোবাসার সমীকরণ। নিখুঁত হওয়ার এই কৃত্রিম অভিনয়ের বদলে বর্তমানে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ডেটিংয়ের এক নতুন ধারা—‘গবলিনটিমেসি’ (Goblintimacy)।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সম্পর্কের এই নতুন প্রবণতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

‘গবলিনটিমেসি’ ধারণার মূল সুর হলো—সম্পর্কের একদম শুরুতেই কোনো ধরনের কৃত্রিমতার আশ্রয় না নিয়ে নিজের ভালো-মন্দ, অদ্ভুত অভ্যাস, সীমাবদ্ধতা ও আসল ব্যক্তিত্বকে সততার সাথে সঙ্গীর সামনে উন্মোচিত করা। সোজা কথায়, অপর মানুষের মনে জায়গা করে নিতে নিজের চরিত্র বা আচরণ রূপান্তরের কোনো প্রয়োজন নেই।

কেন বাড়ছে ‘গবলিনটিমেসি’র জনপ্রিয়তা?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বর্তমান যুগে মানুষ প্রতিনিয়ত নিজের জীবনকে অতি-সোশাল ও নিখুঁত হিসেবে প্রদর্শন করার এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তবে অনলাইনের কাল্পনিক ছবির সাথে বাস্তব জীবনের মিল না থাকায় পরবর্তীতে সম্পর্কে বড় ধরনের ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। এই কারণেই বাস্তবভিত্তিক সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ট্রেন্ডটি জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি মূল কারণ রয়েছে:

  • মানসিক চাপমুক্তি: নিজেকে সারাক্ষণ ‘পারফেক্ট’ বা নিখুঁত দেখানোর যে ক্লান্তি ও মানসিক চাপ, তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

  • মানানসই সঙ্গী নির্বাচন: পরিচয়ের শুরুতেই দুজন মানুষের মানসিকতা, ব্যক্তিত্ব ও জীবনধারার মিল কতটুকু—তা সহজে বোঝা যায়।

  • লুকোচুরি বা অভিনয়ের অবসান: সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় নাটকীয়তা বা আড়াল করার প্রবণতা দূর হয়।

  • স্থায়ী বিশ্বাস তৈরি: শুরুতেই একে অপরকে বাস্তবিকভাবে গ্রহণ করায় দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্কে নিরাপত্তা ও গভীর বিশ্বাস গড়ে ওঠে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী রাশি গুরনানি জানান, সম্পর্কে শুরু থেকে সৎ থাকলে নিজেকে লুকিয়ে রাখার বাড়তি কোনো চাপ থাকে না। এটি মানসিক স্বস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সম্পর্কের মধ্যে একধরনের নিরাপদ বলয় তৈরি করে।

সততা বনাম সীমানা: বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

নিজের আসল রূপ দেখানোর অর্থ কিন্তু প্রথম দিনেই জীবনের সব গোপন কথা বলে দেওয়া নয়—এমনটাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন মনোবিজ্ঞানীরা।

রাশি গুরনানি সতর্ক করে বলেন, "নিজের মতো থাকার অর্থ এই নয় যে পরিচয়ের প্রথম সাক্ষাতেই অতীতের ট্রমা, পারিবারিক সব জটিলতা বা কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা উজাড় করে দিতে হবে। আত্মপ্রকাশ এবং অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশের (Over-sharing) মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সীমারেখা রয়েছে। সম্পর্কে সময় দেওয়া এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরির সাথে সাথে ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত গল্পগুলো শেয়ার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।"

সুস্থ ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের জন্য বিশেষজ্ঞরা তিনটি প্রধান উপাদানের ওপর জোর দিচ্ছেন—সততা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ব্যক্তিগত সীমারেখা (Boundaries)। তাই অভিনয়ের ফাঁদ এড়িয়ে নিজেকে যেভাবে আছেন ঠিক সেভাবে উপস্থাপন করা ইতিবাচক হলেও, তার সাথে প্রয়োজন ধৈর্য ও সঠিক ভারসাম্য।

মন্তব্য করুন