ভারতের ছাত্র আন্দোলন নিয়ে কোণঠাসা মোদি সরকার: দ্য ওয়ার-এর বিশ্লেষণ

প্রকাশ: বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৮ অপরাহ্ণ
ভারতের ছাত্র আন্দোলন নিয়ে কোণঠাসা মোদি সরকার: দ্য ওয়ার-এর বিশ্লেষণ
দিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান ছাত্র-যুব আন্দোলন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতে চিকিৎসা সংক্রান্ত সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট) সহ একাধিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার চরম প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে অনলাইনে শুরু হওয়া প্রতিবাদী আগুন এখন পূর্ণমাত্রায় আছড়ে পড়েছে রাজধানী দিল্লির রাজপথে। হাজার হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও তরুণদের এই বিশাল স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারকে অভূতপূর্ব রাজনৈতিক চাপ ও গভীর দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।

শুরুর দিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ ও গ্রেপ্তার। কিন্তু দিন গড়ানোর সাথে সাথে এবং সরকারের ধারাবাহিক ঔদাসীন্যের মুখে বিক্ষোভকারীরা এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর প্রশাসনের সরাসরি জবাবদিহি দাবি করছেন। আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, স্রেফ একজন মন্ত্রীকে বলির পাঁঠা বানিয়ে পার পাওয়া যাবে না; বছরের পর বছর ধরে চলা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় শীর্ষ সরকারকেই নিতে হবে।

আন্তর্জাতিক ও ডাচ-ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এবারের তরুণদের এই আন্দোলন বিগত সময়ের যেকোনো প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও ব্যতিক্রমী। ভারতীয় ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ার-এর একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এই আন্দোলনের কৌশলগত গুরুত্ব ও সরকারের দুশ্চিন্তার প্রধান কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে:

১. আন্দোলনের মূল লক্ষ্যবিন্দু এখন সরাসরি মোদি

প্রথমদিকে কেবল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতেই আন্দোলন সীমাবদ্ধ থাকলেও পরীক্ষা বাতিলের জেরে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা, ফলাফল জালিয়াতি এবং চাকরি নিয়োগে চরম ব্যর্থতার দায় এখন সরাসরি মোদি সরকারের ওপর বর্তেছে। রাজপথে নামা ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের বার্তা খুব স্পষ্ট—সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে, স্রেফ প্রশাসনিক কৌশল দেখিয়ে পার পাওয়া যাবে না।

২. দলীয় বা প্রথাগত সংগঠনের নিয়ন্ত্রণহীনতা

প্রথমে 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি) ও পরিবেশবাদী পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুকের মতো ব্যক্তিত্বদের সমর্থনে প্রতীকী সূচনা হলেও বর্তমানে এই আন্দোলনটি পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্ত তরুণ আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছে। দিল্লির যন্তর-মন্তর কিংবা সংসদ ভবন অভিমুখে যেসব তরুণ-তরুণী জড়ো হচ্ছেন, তাঁদের সিংহভাগই প্রথাগত কোনো রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন বা পেশাদার নেতৃত্বের অধীনস্থ নন। সাধারণ তরুণেরা নিজস্ব উদ্যোগেই রাজপথে নেমে এসেছেন। কোনো একক শীর্ষ নেতৃত্ব না থাকায় এই আন্দোলনকে দমন করা বা কোনো টেবিল বৈঠকে আলোচনার নামে নিষ্ক্রিয় করা সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৩. ভোঁতা হয়ে যাওয়া পুরনো রাজনৈতিক ছক

বিগত আন্দোলনগুলোতে কেন্দ্র সরকার প্রায়শই ধর্মীয় মেরুকরণ, জাতির পরিচয় কিংবা 'দেশবিরোধী' বা রাজনৈতিক তকমা এঁটে বিক্ষোভকে সাধারণ সমাজ থেকে আলাদা করে দিত। কিন্তু এবারের আন্দোলন গড়ে উঠেছে তরুণের জীবনের একদম বাস্তব ও মৌলিক সমস্যাগুলোকে কেন্দ্র করে—যার মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, স্বচ্ছ পরীক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও নিজেদের চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ফলে এ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের ওপর প্রথাগত 'রাজনৈতিক শত্রু' বা 'বিভাজনমূলক' ট্যাগ লাগানো সরকারের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৪. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর গণ-অনাস্থা

আন্দোলনকারীদের বড় অংশই মনে করছেন যে—আদালতের ধীরগতি, সংসদের নীরবতা কিংবা মূলধারার মিডিয়ার উদাসীনতা তাদের জীবনমরণ সমস্যার কোনো টেকসই সমাধান দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক আইনি ও গণতান্ত্রিক পথগুলো তাদের হতাশ করায়, তরুণ সমাজ এখন রাজপথকেই নিজেদের দাবি আদায়ের একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বেছে নিয়েছে।

৫. সরকারের নীরবতা, অনমনীয়তা ও পুলিশি দমননীতি

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় এক মাসের বেশি সময় ধরে বিশাল এই জনবিক্ষোভ অব্যাহত থাকলেও সরকারের উচ্চপর্যায়ের কোনো ক্ষমতাবান প্রতিনিধি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সাথে কোনো ধরনের অর্থবহ সংলাপে বসেননি। বারবার প্রশ্নফাঁসের পেছনে কারা দায়ী, শিক্ষা খাত সংস্কারের রূপরেখা কী এবং শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এমন সব মৌলিক প্রশ্নে পেন্টাগনতুল্য নিরবতা পালন করে চলেছে প্রশাসন।

এখনো পর্যন্ত সরকার কেবল নীরবতা, ইন্টারনেট বন্ধ, সাঁজোয়া যান, ভারী পুলিশি পাহারা, টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জের মাধ্যমেই এই বৈপ্লবিক কণ্ঠকে চেপে ধরার চেষ্টা করছে। তবে বিশ্লেষকদের অভিমত—এই দমনপীড়নের পুরোনো কৌশল এবার আর কাজ করছে না। টিয়ার গ্যাস ও মামলার ভয় উপেক্ষা করে তরুণরা প্রতিদিন নতুন করে রাজপথে ভিড় জমাবে, যা শেষ পর্যন্ত মোদি সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভাবমূর্তির জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

মন্তব্য করুন