ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও লিভারের যত্নে জামের উপকারিতা
জীবনযাপন ডেস্ক:গ্রীষ্মের তীব্র গরম পড়ার পরপরই দেশের বাজারে চেনা ফালের তালিকায় দেখা মেলে টক-মিষ্টি স্বাদের ছোট ও রসালো ফল জামের। বেগুনি বা কালো রঙের এই ফলটি কেবল আমাদের মুখের রুচি বা জিভের স্বাদই বাড়ায় না, বরং মানব শরীরের ভেতরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে দারুণ উপযোগী। বিশেষ করে শরীরের প্রধান পরিপাক অঙ্গ লিভার বা যকৃতের যত্নে জাম অত্যন্ত অলৌকিক ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে এখন জোর দিয়ে জানাচ্ছেন পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকেরা।
আজ বুধবার (১০ জুন) অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘লাইফস্টাইল, ঘরকন্না, ডায়েট চার্ট ও পুষ্টিবিজ্ঞান’ এবং ‘ফিটনেস, মানসিক স্বাস্থ্য ও সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে জামের ওষুধি গুণাগুণ এবং খাওয়ার নিয়মকানুন বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
বর্তমানে ভুল খাদ্যাভ্যাস ও অলস জীবনযাপনের কারণে দেশের তরুণ সমাজের মধ্যে ‘ফ্যাটি লিভার’ (যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমা) এর সমস্যা খুব দ্রুত ও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় নিয়মিত জাম রাখার জন্য বিশেষ পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, জামের মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট এবং প্রদাহরোধী (অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি) উপাদান, যা সরাসরি লিভারের সুস্থ কোষগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা দেয়। সাধারণত লিভারে ফ্যাট বা চর্বি জমতে শুরু করলে শরীরের ভেতরের কিছু নির্দিষ্ট এনজাইমের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যা লিভার ড্যামেজের কারণ হতে পারে। নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে জাম খেলে সেই অভ্যন্তরীণ ক্ষতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। চিকিৎসকদের মতে, যাদের প্রাথমিক স্তরের (গ্রেড-১) ফ্যাটি লিভার রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে সুষম ও কম চর্বিযুক্ত খাবারের পাশাপাশি জাম খাওয়া বেশ ভালো ফলাফল দেয়।
জাম রক্তে শর্করার (গ্লুকোজ) মাত্রা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে মানবদেহের ইনসুলিনের ভারসাম্যের বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের একটি সরাসরি ও গভীর যোগসূত্র রয়েছে। জাম এই ইনসুলিনের কার্যকারিতা ঠিক রাখতে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
জামে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডায়েটারি আঁশ বা ফাইবার। এই ফাইবার মানুষের অন্ত্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে এবং শরীরের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) দারুণভাবে উন্নত করে। যারা ওজন কমানোর ডায়েট চার্ট অনুসরণ করছেন, তাদের জন্য জাম একটি আদেশ ফল। কারণ এটি অত্যন্ত কম ক্যালরিযুক্ত একটি ফল, যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখতে সাহায্য করে এবং ওজন দ্রুত কমায়।
পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছ থেকে পাড়া একদম টাটকা ও তাজা জাম ভালো করে বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ধুয়ে সরাসরি চিবিয়ে খাওয়াই স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উত্তম। অনেকে জামের ভেতরের কষ বা অতিরিক্ত টকভাব কমাতে সামান্য বিট লবণ বা গুঁড়ো মরিচ দিয়ে ঝাঁকিয়ে মাখিয়ে খেতে পছন্দ করেন। এ varia-র পাশাপাশি গরমের দিনে রিফ্রেশিং পুষ্টি পেতে ব্লেন্ডারে জামের পাল্প দিয়ে তৈরি স্মুদি কিংবা ফলের বাটিতে (ফ্রুট সালাদ) অন্যান্য ফলের সাথে মিশিয়েও এটি চমৎকারভাবে খাওয়া যেতে পারে।
জামের হাজারো পুষ্টিগুণ থাকলেও এটিকে কখনোই লিভার বা ডায়াবেতিসের মূল চিকিৎসকের দেওয়া অফিশিয়াল ওষুধের বিকল্প ভাবা একদমই উচিত নয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সঠিক লো-কার্ব খাবার ও নিয়মিত ব্যায়ামের পাশাপাশি এটি কেবল একটি সহায়ক বা সাপ্লিমেন্টারি খাবার মাত্র।
কোনো কিছুই অতিরিক্ত ভালো নয়। পরিমাণের চেয়ে বেশি বা একসাথে অনেক জাম খেলে এতে থাকা উপাদানের কারণে উল্টো পেটে গ্যাস বা কোষ্ঠকাঠিন্যের (কনস্টিপেশন) সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যারা ইনসুলিন বা ডায়াবেতিসের নিয়মিত কড়া ওষুধ সেবন করেন, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে জামের দৈনিক পরিমাণ ঠিক করা উচিত। কারণ, জামের নিজস্ব উপাদানের কারণে রক্তে সুগারের মাত্রা অতিরিক্ত বা আকস্মিকভাবে কমে গিয়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জামের একটি বড় মাইনাস পয়েন্ট হলো এটি খুব দ্রুত পচে বা নষ্ট হয়ে যায়। তাই বাজার থেকে কেনার পর বা খাওয়ার আগে ফলের গায়ে কোনো ছত্রাক বা পচন ধরেছে কি না, তা ভালো করে দেখে নেওয়া জরুরি।
জান্নাত সকালবেলা
|