কবর থেকে চিত্রনায়ক সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের নির্দেশ আদালতের

প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ০৫:২৪ অপরাহ্ণ
কবর থেকে চিত্রনায়ক সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের নির্দেশ আদালতের

বিনোদন ডেস্ক:ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ক্ষণজন্মা নায়ক সালমান শাহর মৃত্যুরহস্য তিন দশক ধরে এ দেশের কোটি ভক্ত ও আপামর জনতার কাছে এক অমীমাংসিত প্রশ্ন। ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক ঘটনার প্রকৃত সত্য ও হত্যার কারণ উদঘাটনে এবার এক যুগান্তকারী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আইনি ও ফরেনসিক প্রমাণের সত্যতা নিশ্চিত করতে প্রখ্যাত এই চিত্রনায়কের (চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন) মৃতদেহ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কবর থেকে উত্তোলন, নতুন করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার অনুমতি দিয়েছেন ঢাকার সিএমএম আদালত।

আজ বুধবার (১০ জুন) বিকেল ৪টা ৫২ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ঢালিউড, গ্ল্যামার, ওটিটি ফ্ল্যাশ ও তারকা খতিয়ান’ এবং ‘আদালত প্রাঙ্গণ, অপরাধ খতিয়ান ও সিআইডি ইনভেস্টিগেশন উইং’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে এই চাঞ্চল্যকর আদেশের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে ধরা হলো।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি পুলিশের পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা গত ২৪ মে এই আদেশ মঞ্জুর করেন। এর আগে গত ২০ মে সিআইডির পক্ষ থেকে আদালতে এই আবেদন দাখিল করা হয়েছিল, যা আজ বুধবার (১০ জুন) সিআইডি পরিদর্শক নিজে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আদালতের অনুমতি মিলেছে এবং আনুষঙ্গিক কিছু অফিশিয়াল কার্যক্রম শেষ করেই সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার প্রাঙ্গণ কবরস্থান থেকে সালমান শাহর লাশ উত্তোলনপূর্বক সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের কাজ শুরু হবে।

আদালতের নথিসূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর (৬৮) বাদী হয়ে এই হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। তিনি সালমানের মা নিলুফা জামান চৌধুরী নীলা চৌধুরীর পক্ষে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে মামলাটি পরিচালনা করছেন।

এজাহার ও মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সালমানের মা নীলা চৌধুরী, বাবা মৃত কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং ছোট ভাই শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার ১১/বি নম্বর ফ্ল্যাটে সালমানের সাথে দেখা করতে যান। তখন সালমানের স্ত্রী সামীরা হক এবং গৃহকর্মী আবুল জানান যে সালমান ঘুমাচ্ছেন। এরপর তারা গ্রিন রোডের বাসায় ফিরে যাওয়ার পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফোন আসে যে সালমানের কিছু একটা হয়েছে। দ্রুত তারা ইস্কাটনের বাসায় ফিরে শয়নকক্ষের খাটের ওপর সালমানকে মরার মতো নিথর পড়ে থাকতে দেখেন।

বাদীর বর্ণনা মতে, সে সময় শয়নকক্ষে কয়েকজন বহিরাগত নারী সালমানের হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন এবং পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন। সালমানের পরিবার তাঁকে দ্রুত হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যান এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্ত শেষে সে বছরই সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার প্রাঙ্গণে তাঁকে দাফন করা হয় এবং রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

দীর্ঘদিন ধরে সালমানের পরিবার তাঁর মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছিল। সালমানের পিতা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী জীবিত থাকাকালীন ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই চিফ মেট্রো ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অপমৃত্যু মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর মামা মোহাম্মদ আলমগীর আইনি লড়াই চালিয়ে যান। গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদী পক্ষের করা রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে এটিকে সরাসরি ‘হত্যা মামলা’ হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। যার প্রেক্ষিতে ২১ অক্টোবর রমনা থানায় দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় (পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও সাধারণ অভিপ্রায়) মামলাটি নথিভুক্ত হয়।

এই হাই-প্রোফাইল হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আসামিরা হলেন— সালমানের স্ত্রী সামীরা হক, বিতর্কিত শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস সাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদ (১৭)। এছাড়াও মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে।

মামলার অভিযোগে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হাসপাতালে নেওয়ার পথে সালমানের গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে স্পষ্ট নীলচে দাগ দেখা গিয়েছিল। আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরস্পর যোগসাজশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে বাদীর দৃঢ় বিশ্বাস। সিআইডি জানিয়েছে, অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করে থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে তারা রেহাই পাবেন, তবে বাকি জীবিতদের আইনের আওতায় আনতে এবং মৃত্যুর আসল ফরেনসিক কারণ জানতেই এই লাশ উত্তোলনের আদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

জান্নাত সকালবেলা

মন্তব্য করুন