মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস: নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ

প্রকাশ: বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০২ অপরাহ্ণ
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস: নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ
মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও নতুন কৌশলগত জোটের প্রতীকী দৃশ্য।

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গাজায় ইসরাইলের ভয়াবহ যুদ্ধ ও হত্যাযজ্ঞ শুরুর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে দখলকৃত পশ্চিম তীর, দক্ষিণ লেবানন এবং ইরানেও ছড়িয়ে পড়েছে সামরিক সংঘাত। তুরস্ক ও আরব বিশ্ব শুরু থেকেই এই তাণ্ডবের তীব্র নিন্দা জানালেও বাস্তবক্ষেত্রে তা ঠেকানোর কার্যকর কৌশলের অভাব ফুটে উঠেছে। এই জটিল রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি' মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার এক বিশ্লেষণে এই চুক্তিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে— "আমেরিকা অবিশ্বস্ত: সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি" হিসেবে। চীনা বিশ্লেষক ইয়ান শুয়েতুংয়ের মতে, এই চুক্তি শুধুমাত্র একটি 'ইসলামিক ন্যাটো' গড়ার প্রয়াস নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট সামরিক অনিশ্চয়তার সরাসরি ফল। আরব ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো বুঝতে পেরেছে, কেবল ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করা আর সম্ভব নয়।

জোটের সামরিক সক্ষমতা (কাগজে-কলমে):

  • সম্মিলিত জিডিপি: প্রায় ৩.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

  • সামরিক শক্তি: ৫,৬০০-এর বেশি প্রধান যুদ্ধট্যাংক, ১,১০০-এরও বেশি আধুনিক যুদ্ধবিমান, শক্তিশালী ড্রোন বহর এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।

  • কৌশলগত ভারসাম্য: বিশাল পদাতিক বাহিনীর পাশাপাশি পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রযুক্তি ও অস্ত্রভাণ্ডার।

তিন দেশের আলাদা হিসাব-নিকাশ:

যদিও চুক্তিতে অভিন্ন নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে, কিন্তু দেশগুলোর নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থ ভিন্ন:

  • পাকিস্তান: মারাত্মক অর্থনৈতিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ মোকাবিলা করার পাশাপাশি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা।

  • তুরস্ক: ভবিষ্যতে সম্ভাব্য পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে তোলা, দক্ষিণ সিরিয়া থেকে ইসরাইলি বাহিনী হটাতে নতুন দামেস্ক প্রশাসনকে সহায়তা করা এবং নিজস্ব দ্রুত বর্ধনশীল অস্ত্র শিল্পের বাজার সম্প্রসারণ করা।

  • সৌদি আরব: ইরান ও ইয়েমেনের হুতিদের থেকে সুরক্ষায় কৌশলগত হাতিয়ার গড়ে তোলা এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন’ বাস্তবায়ন নিশ্চিতে অঞ্চলজুড়ে স্থিতিশীলতা আনা।

আমেরিকার ওপর আস্থা সংকটের কারণ:

হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ইরানের সাথে সমঝোতা দুর্বল হওয়া, সৌদি-আমেরিকা পারমাণবিক চুক্তিতে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বাধ্যবাধকতা জুড় দেওয়া এবং গাজায় দফায় দফায় শর্ত পরিবর্তন করে যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ করার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে তেলআবিবের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ সৃষ্টির ক্ষমতা সীমিত। গাজায় হামাসকে নিরস্ত্র করার বাহানায় বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনিকে স্থায়ীভাবে বাস্তুচ্যুত করার যে ষড়যন্ত্র ও কৌশল ইসরাইল নিচ্ছে, তা ১৯৮২ সালের বৈরুতের সাবরা ও শাতিলা শরণার্থী শিবিরের ভয়াবহ গণহত্যার স্মৃতিকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

ভবিষ্যৎ প্রভাব ও উপসংহার:

মক্কা চুক্তির প্রভাব হয়তো রাতারাতি রণক্ষেত্রে দেখা যাবে না, কারণ ইয়েমেনের হুতিদের মতো আঞ্চলিক অস্থিরতা এখনও অব্যাহত। তবে দীর্ঘমেয়াদে রিয়াদ-আঙ্কারা-ইসলামাবাদ অক্ষ কার্যকর হলে তেলআবিবের একচেটিয়া সামরিক আগ্রাসনের পরিসর সংকুচিত হয়ে আসবে। মিসরের মতো অন্যান্য প্রধান আরব দেশগুলো যদি পরবর্তীতে এই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হয়, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যকে বহিরাগত শক্তি ও ইসরাইলকেন্দ্রিক শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা সংঘাত চক্র থেকে বের করে এক নতুন আত্মনির্ভরশীল যুগে নিয়ে যেতে পারে।

মন্তব্য করুন