অসহনীয় দাবদাহে দিল্লির বস্তিতে ৫৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা

প্রকাশ: সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৭ অপরাহ্ণ
অসহনীয় দাবদাহে দিল্লির বস্তিতে ৫৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা
দিল্লির সুন্দর নগরী বস্তির সরু গলিতে দাবদাহের মধ্যে খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ।

অনলাইন ডেস্ক: ভারতের রাজধানী দিল্লিতে চলমান তীব্র ও নজিরবিহীন দাবদাহে সবচেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন নগরীর বস্তি এলাকার খেটে খাওয়া নিম্নআয়ের মানুষ। উত্তর-পূর্ব দিল্লির সুন্দর নগরী বস্তির বেশ কয়েকটি অংশে তাপমাত্রা অবিশ্বাস্যভাবে ৫৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে। অসহনীয় এই প্রচণ্ড গরমে কীভাবে মানুষ বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, তার দৈনিক হিসাব এখন তারা নিজেরাই লিখে রাখছেন।

পরিবেশবাদী সংস্থা ‘গ্রিনপিস ইন্ডিয়া’র কারিগরি সহযোগিতায় সুন্দর নগরীর প্রায় ৪০টি পরিবার বিশেষ এই ডায়েরিটি প্রস্তুত করছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘গর্মি খাতা’ বা ‘হিট রেজিস্ট্রি’। এই খাতায় কেবল রেকর্ড হওয়া তাপমাত্রার হিসাব নয়; বরং অতিরিক্ত গরমের কারণে বাসিন্দাদের শরীরে দেখা দেওয়া রোগব্যাধি, আয়ের পথ বন্ধ হওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে নিত্যদিনের কষ্টের বিস্তারিত বিবরণ সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

৩৯ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা গুলশান চার সন্তানকে নিয়ে মাত্র এক কক্ষের একটি ছোট ঘরে বসবাস করেন। সেখানে এসি কেনার কোনো সামর্থ্য তাদের নেই। ঘরে থাকা সস্তা এয়ার কুলারটি চালাতে গেলেও বিদ্যুৎ বিলের আশঙ্কায় বেশি সময় চালানো যায় না। ফলে গরমের হাত থেকে সামান্য স্বস্তি পেতে রাতে ঘুমানোর আগে মেঝে ও পরনের কাপড় পানিতে ভিজিয়ে রাখেন তারা। তবে টানা ভেজা কাপড় ব্যবহারের কারণে এখন পরিবারের সদস্যরা চর্মরোগ ও ত্বকের মারাত্মক সংক্রমণে ভুগছেন।

একই বস্তির ১৯ বছর বয়সী দূরশিক্ষণের শিক্ষার্থী আরশি তাঁর পরিবারের ছয় সদস্যের সঙ্গে এক কক্ষেই বাস করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সংসার চালাতে মা ও বোনের সঙ্গে ট্রাকের আলংকারিক ঝালর তৈরির কাজ করেন তিনি, যার মাধ্যমে দিনে মাত্র ১৫০ রুপি আয় হয়। ঘরে অতিরিক্ত উত্তাপ ও ৮৪.৬ শতাংশ আর্দ্রতার কারণে ভিতরের ফিলস-লাইক (অন অনুভূত) তাপমাত্রা ৩৬.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। ফলে বদ্ধ সেই ঘরে কাজ করাই অসম্ভব হয়ে পড়ে।

প্রচণ্ড তাপে জীবিকা হারিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন ২১ বছর বয়সী ভাসমান সবজি বিক্রেতা রাজা। প্রচণ্ড গরমে ভ্যানগাড়ির সবজি দ্রুত পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া রাস্তায় ক্রেতাদের চলাচল কমে যাওয়ায় তাঁর দৈনিক আয় মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সারাদিনের কাঠফাটা রোদ শেষে রাতেও ঘরের তাপমাত্রা না কমায় তাঁকে বাধ্য হয়ে টিনের ছাদেই ঘুমাতে হয়।

সম্প্রতি ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে চরম তাপপ্রবাহকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যাতে রাজ্যগুলো জরুরি ত্রাণ তহবিল ব্যবহার করতে পারে। সুন্দর নগরীর ভুক্তভোগী মানুষের এই চরম অভিজ্ঞতার নথিগুলো এখন ভারতের ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন’-এর কাছেও পেশ করা হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও মানবাধিকারকর্মীরা দাবি তুলেছেন, চরম উষ্ণতা ও দাবদাহকে মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে, যাতে বস্তিবাসী ও খোলা আকাশের নিচে কাজ করা উন্মুক্ত শ্রমিকদের জন্য জরুরি সুরক্ষাবলয় ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

মন্তব্য করুন