চলচ্চিত্রের স্বপ্নদ্রষ্টা তারেক মাসুদের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
বিনোদন ডেস্ক: বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অনন্য ভাষা, বিশ্বমানের নির্মাণশৈলী ও গভীর চিন্তার ছাপ রেখে যাওয়া বরেণ্য চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট তাঁর পরবর্তী স্বপ্নের চলচ্চিত্র ‘কাগজের ফুল’-এর শুটিং লোকেশন দেখে ঢাকা ফেরার পথে মানিকগঞ্জের ঘিওরে ঢাকা-অরিচা মহাসড়কে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি অকালে মৃত্যুবরণ করেন। ওই দুর্ঘটনায় তাঁর সহযাত্রী বিশিষ্ট সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরসহ আরও তিনজন প্রাণ হারিয়েছিলেন।
তারেক মাসুদ ১৯৫৬ সালের ৬ ডিসেম্বর ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নূরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে মাদরাসা শিক্ষার মাধ্যমে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হলেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি সাধারণ শিক্ষায় স্থানান্তরিত হন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তিনি রাজনীতি, সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাব যুক্ত হন।
চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জীবন ও দর্শন নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’ নির্মাণ করতে গিয়ে প্রায় সাত বছর প্রখ্যাত এই শিল্পীর সান্নিধ্যে কাটান তিনি। ১৯৮৯ সালে এটি মুক্তির মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রকার হিসেবে তাঁর পথচলা শুরু হয়।
তবে মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত ঐতিহাসিক প্রামাণ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’ তারেক মাসুদকে সারা দেশে ও প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। মার্কিন পরিচালক লিয়ার লেভিনের ১৯৭১ সালের ধারণকৃত দুর্লভ ফুটেজ সংগ্রাহ করে স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি এটি নির্মাণ করেন, যা পরবর্তীকালে বাংলা চলচ্চিত্রের এক অবিচ্ছেদ্য জাতীয় দলিলে পরিণত হয়। পরে এর ধারাবাহিকতায় সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে নির্মিত হয় ‘মুক্তির কথা’।
বিশ্ব চলচ্চিত্রে তারেক মাসুদ সবচেয়ে বড় সাফল্য অর্জন করেন ২০০২ সালে। তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র ‘মাটির ময়না’ ক্যান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে মর্যাদাপূর্ণ ‘ফিপ্রেস্কি’ (FIPRESCI) পুরস্কার লাভ করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা চলচ্চিত্রের নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয় তাঁর হাত ধরেই।
তারেক মাসুদের অন্যান্য বিখ্যাত সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে ‘অন্তর্যাত্রা’—যেখানে প্রবাসীদের শেকড়ের টানকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘নরসুন্দর’ এবং জঙ্গিবাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তৈরি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ছবি ‘রানওয়ে’।
শিল্পচর্চা ও সমাজভাবনায় তারেক মাসুদ ছিলেন এক নির্ভীক পথিকৃৎ। জাতীয় আত্মপরিচয়, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রায় রূপ লাভ করেছে। ১৫তম প্রয়াণ দিবসে এই মহান শিল্পীর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গন।
|