লালপুরে ঘোড়ার গাড়িতে শিক্ষককে রাজকীয় বিদায়

প্রকাশ: শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৬:০৯ অপরাহ্ণ
লালপুরে ঘোড়ার গাড়িতে শিক্ষককে রাজকীয় বিদায়

লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি: নাটোরের লালপুর উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে অনুষ্ঠিত হলো শিক্ষক বিদায়ের এক ব্যতিক্রমী ও হৃদয়স্পর্শী অনুষ্ঠান। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসরে যাওয়া সহকারী শিক্ষক মো. সিরাজ উদ্দিনকে ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে এক রাজকীয় ও স্মরণীয় বিদায় জানিয়েছে তাঁর প্রিয় প্রতিষ্ঠান।

আজ শনিবার (৪ জুলাই) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার বড়বাদকয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এই বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তৈরি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোছা. নাসিমা খাতুনের সভাপতিত্বে এই বিদায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. লুৎফর রহমান। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “শিক্ষক সিরাজ উদ্দিন শুধু একজন সাধারণ শিক্ষক ছিলেন না, তিনি এই অনগ্রসর এলাকার শিক্ষার সত্যিকারের আলোকবর্তিকা ছিলেন। তাঁর এই মহান অবদান লালপুরবাসী চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখবে।”

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন—বিদ্যালয়ের সভাপতি মো. আবু বক্কর সিদ্দিক, প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি মো. বশির উদ্দিন, ৫ নং বিলমাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. মুজিবুর রহমান, সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবুল কাশেম, বিলমাড়ীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. শমজান আলী, লালপুর শ্রীসুন্দরী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. শাজেউল ইসলাম এবং স্থানীয় বিএনপি নেতা মাইনুল ইসলাম ভুট্টু।

প্রিয় শিক্ষকের বিদায়লগ্নে আবেগ সামলাতে পারেনি বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র মো. মুনতাসিন আলী ও চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী লামিয়া খাতুন তাদের প্রিয় ‘সিরাজ স্যারের’ প্রতি গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বক্তব্য দেয়। তাদের সেই আবেগঘন কণ্ঠ উপস্থিত অতিথি ও শিক্ষকদের চোখ অশ্রুসিক্ত করে তোলে।

এই বিদায় অনুষ্ঠানের সবচেয়ে মূল আকর্ষণ ছিল সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে করে প্রিয় শিক্ষককে সম্মান জানিয়ে তাঁর বাড়ি পৌঁছে দেওয়া। স্কুল মাঠ থেকে বর্ণাঢ্য এই শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে গ্রামের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে তাঁকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় বাসিন্দারা করতালি এবং ফুল ছিটিয়ে প্রিয় শিক্ষককে শেষ অভিবাদন জানান।

অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে শিক্ষক সিরাজ উদ্দিনের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে এক বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গাছ রোপণ কর্মসূচি এবং শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়।

বড়বাদকয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা ও সুনামের সঙ্গে শিক্ষাদান করে আসছিলেন শিক্ষক সিরাজ উদ্দিন। স্থানীয়দের মতে, তাঁর এই অবসর কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বিদায় নয়, বরং একটি গৌরবোজ্জ্বল যুগের অবসান। লালপুরবাসীর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, একজন আদর্শ শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, তিনি সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারিগর।

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন