আজ সোমবার (১ জুন) সকাল ১০টা ৫৩ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘ফিচার’ ও ‘ভ্রমণ ও পর্যটন’ বিভাগের এক বিশেষ ডায়েরি প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ি জেলার শেষ প্রান্তে অবস্থিত এই রহস্যময় অযোধ্যা গ্রাম, বড় খুম এবং গলাচিপা খুমের শ্বাসরুদ্ধকর হাইকিং ও ট্র্যাকিংয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
পাহাড়ের সেই অচেনা রূপের টানে আমরা একদল অভিযাত্রী রাতের বাসে চেপে ছুটে যাই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য লাগোয়া পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার দুর্গম তবলছড়িতে। সারারাত পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তার জার্নি শেষে ভোরের আলো ফুটতেই নেমে পড়ি স্থানীয় ডাকবাংলোতে। সেখান থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয় যামিনীপাড়া গ্রামের মেঠোপথে। সকালের সোনামাখা রোদ, পাহাড়ি গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা, গাছের ঘন পাতার ফাঁক গলে আসা সূর্যের তির্যক কিরণ আর অচেনা পাহাড়ি পাখিদের মিষ্টি কলতান— সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় অনুভূতি। ২০-২২ মিনিট হেঁটে আমরা আমাদের পূর্বপরিচিত শাহজাহানের সুবাদে পরিপাটি এক মাটির ঘরের সামনে হাজির হই, যেখানে আমাদের রাতের থাকার ব্যবস্থা। ট্রাভেল ব্যাগগুলো ঘরের ভেতর রেখে কোনো সময় নষ্ট না করেই আমরা বেরিয়ে পড়ি ‘বড় খুম’ ঝরনার উদ্দেশ্যে।
চৈতালি তীব্র রোদের মাঝে ইটের সলিং বিছানো রাস্তায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর আমরা পৌঁছাই ত্রিপুরা উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পল্লীর ‘বড়পাড়া’ গ্রামে। সেখানে পাহাড়ানি জুম চাষের তাজা তরমুজ খেয়ে বুকের তৃষ্ণা মিটিয়ে আমরা তরতর করে ঢুকে পড়ি এক বিশাল সেগুন অরণ্যের গহীনে। বৃক্ষরাজির মগডালে তাকালে হৃদয়ে অদ্ভুত এক আদিম শিহরন জেগে ওঠে। কাঁধে-মাথায় হাড়ি-পাতিল ও রান্নার বাজার-সদাই নিয়ে শুরু হয় মূল হাইকিং ও ট্র্যাকিং। পাহাড়ের ঝরাপাতার ওপর দিয়ে হাঁটার সময় ‘মরমর’ শব্দ এক ভিন্ন রোমাঞ্চ তৈরি করছিল; কোথাও কোথাও পাতার স্তূপ জমে প্রায় ২-৩ ফিট উঁচু হয়ে ছিল। সেগুনপাতা মাড়িয়ে অবশেষে আমাদের পা পড়ে শীতল ঝিরির জলে। দুপাশে আকাশছোঁয়া খাড়া পাহাড় আর মাঝখানে ছোট-বড় পাথুরে সারি দিয়ে ঘেরা নয়নাভিরাম ঝিরিপথ। প্রায় দুই ঘণ্টার তীব্র পরিশ্রমের পর দেখা মেলে কাঙ্ক্ষিত ‘বড় খুম’ ঝরনার। চৈত্রের প্রচণ্ড খরাতেও এই ঝরনার পানি প্রবহমান। রিমঝিম শব্দ তুলে অবিরাম ধারায় ঝরনার পানি আছড়ে পড়ছে নিচে, যার ফলে সামনে একটি বিশাল বেসিনের মতো গভীর খাদের সৃষ্টি হয়েছে; স্থানীয় ত্রিপুরারা যেটিকে মূলত ‘খুম’ বা বড় খুম বলে ডাকে।
দুপুরে বড় খুমের কোল ঘেঁষে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আমাদের এবারের গন্তব্য ছিল ‘গলাচিপা খুম’। পথ চলতে চলতে দুপুরের সূর্যটা কিছুটা হেলে পড়ায় আমাদের পায়ের গতি আরও বাড়িয়ে দিতে হলো। অবশেষে আমরা যখন গলাচিপা খুমের প্রান্তরে পৌঁছালাম, তখন আমাদের চোখ চড়কগাছ! জীবনে বহু খুম দেখার অভিজ্ঞতা থাকলেও গলাচিপার আকৃতিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নান্দনিক। এটি দেখতে অবিকল ইংরেজি ‘এস’ (S) অক্ষরের মতো। দেখতে যেমন সুন্দর, এর গভীরতা ও চারপাশের খাড়া পাথুরে দেয়াল ঠিক তেমনি ভয়ংকর। গলাচিপার ওপরের অংশে (Upper Stream) যাওয়ার পথটি ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ ও কণ্টকাকীর্ণ। পায়ের নিচের শুকনো পাতা সামান্য পিছলে গেলেই সোজা হাজার ফুট গভীর খুমের পেটে তলিয়ে যাওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা। ধরার মতো শক্ত কোনো গাছের শিকড়-বাকড়ও ছিল না। প্রকৃতিই সাক্ষ্য দিচ্ছিল যে এখানে এখনও সাধারণ পর্যটকদের পায়ের ধুলো পড়েনি। এমন সংকুল ও রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েই আমরা ঝিরির বরফশীতল পানিতে জলকেলিতে মেতে উঠি, যা আমাদের দেহের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষেই দূর করে দেয়। পাহাড়ে সন্ধ্যা দ্রুত নামে, তাই টনক নড়তেই টর্চের আলো জ্বেলে প্রায় ১২০০ ফিট উঁচু খাড়া পাহাড় বেয়ে গভীর রাতে যামিনীপাড়ায় ফিরে আসি।
পরদিন সকালে মিষ্টি নাশতা সেরে আমাদের মাহিন্দ্রা গাড়ি ছুটল মূল আকর্ষণ ‘অযোধ্যা’র উদ্দেশ্যে। তবে তার আগে আমরা ঘুরে আসি ব্যক্তিউদ্যোগে পরিচালিত পাহাড়চূড়া ‘ঝরনা টিলা’ ও গৌরাঙ্গপাড়া। এরপর গাড়ি এগিয়ে চলে নৈসর্গিক জনপদ পুরাতন তবলছড়ির দিকে। যেতে যেতে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সুউচ্চ পাহাড়ের সারি। হঠাৎ গাড়ি ব্রেক কষতেই দেখি কাঁটাতারের ওপাশে জ্বলজ্বল করছে দুই দেশের সীমান্ত পিলার। শুধুমাত্র একটি সীমানা পিলার আন্তর্জাতিক মানচিত্র ভাগ করে দিলেও, দুই বাংলার মানুষের মনকে ভাগ করার সাধ্য কার আছে? সীমান্ত প্রহরী বিজিবিকে সামান্য কৈফিয়ত দিয়ে রামশিরা এলাকার বুড়ির টিলায় বসে কলাপাতায় দুপুরের ঐতিহ্যবাহী আহার সারলাম।
এরপর আমাদের গাড়ি গিয়ে থামে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) ‘অযোধ্যা বিওপি’ ক্যাম্পের পিলারের কাছে। যতদূর চোখ যায় শুধু অবারিত সবুজ প্রকৃতি ও পাহাড়ের ঢেউ। পাশেই পাহাড়ের চূড়ায় গাছগাছালি ঘেরা অযোধ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই অযোধ্যা গ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্যে যেকোনো মানুষ বিমুগ্ধ হতে বাধ্য। ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এখনও সম্পূর্ণ অচেনা এই স্বর্গরাজ্যের বুক চিরে চলে গেছে নবনির্মিত ‘অযোধ্যা সীমান্ত সড়ক’। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২০ ইসিবি (20 ECB) অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পাহাড়, প্রতিবেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে উঁচু উঁচু পাহাড় কেটে এই পিচঢালা চমৎকার সড়কটি নির্মাণ করেছে।
সীমান্ত সড়কটির একপাশে সিনা টান করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে জগদ্দল পাথরের মতো আমাদের পাহাড়, আর অন্যপাশে পাহাড়ের পাদদেশে সীমানা ভাগ করে বয়ে চলেছে রূপালী ফেনী নদী। মায়াবী এই পথটির কোথাও কোথাও সড়ক এতটাই উঁচু আর খাড়া ঢালু যে, আমাদের মনে হচ্ছিল আমরা মাহিন্দ্রা গাড়িতে নয়, আমেরিকার কোনো থ্রিলার ‘রোলার কোস্টারে’ বসে আছি! অযোধ্যা সীমান্ত সড়ক পাড়ি দিতে দিতে পশ্চিমাকাশে সূর্যটা তার সমস্ত তেজ হারিয়ে এক নতুন বউয়ের মতো লাল টুকটুকে রূপ ধারণ করল। পাহাড়ের বুক চিরে সূর্যাস্তের সেই অনন্য রূপের রেশ কাটতে না কাটতেই আমরা পৌঁছে গেলাম অপরূপা অযোধ্যা সীমান্ত সড়কের শেষ প্রান্তে।
জান্নাত সকালবেলা