আইলার ১৭ বছরেও গাবুরার দুঃখ ঘোচেনি

প্রকাশ: রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ০৫:২৫ অপরাহ্ণ
আইলার ১৭ বছরেও গাবুরার দুঃখ ঘোচেনি

মেহেদী হাসান মারুফ, সাতক্ষীরা: দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ ১৭টি বছর। কিন্তু সাতক্ষীরার শ্যামনগের কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীবেষ্টিত দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার মানুষ এখনো প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’র দেওয়া ক্ষত পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ২০০৯ সালের ২৫ মে আঘাত হানা সেই আইলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল। যার ১৭ বছর পূর্তির আগের দিন আজ রবিবার (২৪ মে) সরেজমিনে দেখা যায়, নদীভাঙন, জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ, তীব্র বিশুদ্ধ পানির সংকট আর কর্মসংস্থানের অভাব আজও গাবুরাবাসীর দৈনন্দিন জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

১৭ বছর আগের সেই আইলার আঘাতে গাবুরা ইউনিয়নের চারপাশের টেকসই বেড়িবাঁধগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। জোয়ারের লোনা পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল পুরো ইউনিয়ন। ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল হাজার হাজার ঘরবাড়ি, মাছের ঘের ও ফসলি জমি। বহু পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে চিরতরে উদ্বাস্তু হয়ে যায়।

আইলার পর উপকূলের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায় ভাঙা বেড়িবাঁধ। অনেক এলাকায় দেড় যুগ পার হতে চললেও স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে পরবর্তী সময়ে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় আম্পান, ইয়াস ও সর্বশেষ রেমালের জলোচ্ছ্বাসে বারবার নতুন করে লোনা পানিতে ভেসেছে এই জনপদ। স্থানীয় বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, “আমরা ঝড় বা বাতাসকে যতটা ভয় পাই না, তার চেয়ে বেশি ভয় পাই আমাদের এলাকার দুর্বল বেড়িবাঁধকে। বাঁধ ভাঙলেই আমাদের সব শেষ।”

আইলার পর মাটিতে লবণাক্ততার পরিমাণ চরমভাবে বেড়ে যাওয়ায় গাবুরায় ঐতিহ্যবাহী ধান ও সবজি চাষের সুদিন শেষ হয়ে গেছে। মাইলের পর মাইল কৃষিজমি এখন অনাবাদি ও বন্ধ্যা হয়ে পড়ে আছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে চিংড়ি চাষে ঝুঁকলেও প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও ভাইরাসের কারণে সেটিও স্থিতিশীল আয়ের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।

গাবুরা ইউনিয়নে বর্তমানে সবচেয়ে তীব্র সংকট সুপেয় পানির। ভূগর্ভস্থ পানি ও স্থানীয় পুকুরগুলোতে অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে তা পানের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পানি সংগ্রহের জন্য স্থানীয় নারী ও শিশুদের প্রতিদিন মাইলের পর মাইল পথ হেঁটে দূরবর্তী কোনো ফিল্টার বা পিএসএফ (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার) থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। লোনা পানি ব্যবহারের কারণে এলাকায় ডায়রিয়া, আমাশয় ও নানা ধরনের চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত ব্যাধি লেগেই থাকে। বিশেষ করে উপকূলের নারীরা প্রজনন স্বাস্থ্যজনিত চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।

স্থানীয় শিক্ষক রবিউল ইসলাম জানান, জলবায়ুজনিত কারণে বাধ্য হয়ে এলাকা ছাড়ার (ক্লাইমেট মাইগ্রেশন) একটি জীবন্ত ও বড় উদাহরণ হলো এই গাবুরা। নদীভাঙন ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতি বছর শত শত পরিবার নিজেদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে ঢাকা বা খুলনার মতো বড় শহরগুলোতে গিয়ে বস্তিবাসী হচ্ছে। পুরুষরা দল বেঁধে ইটভাটায় বা দিনমজুরের কাজে চলে যাচ্ছে। এছাড়া দুর্যোগের সময় স্থানীয় স্কুল-কলেজগুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এই অঞ্চলের শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মাসুদুল আলম ইউনিয়নের মানুষের দুর্দশার কথা স্বীকার করে বলেন, “গাবুরার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অনেক কষ্ট পাচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে ব্লক দিয়ে টেকসই ও মেগা বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। তবে গাবুরাবাসীকে পুরোপুরি সুরক্ষিত করতে হলে টেকসই বাঁধের পাশাপাশি সুপেয় পানির স্থায়ী প্ল্যান্ট স্থাপন, লবণাক্ততা সহনশীল আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি চালু, সুন্দরবন ও নদীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি।”

উপকূলবাসীর কাছে ঘূর্ণিঝড় আইলা কেবল একটি একদিনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না; এটি গাবুরার অর্থনীতি, সামাজিক কাঠামো ও মানুষের জীবনযাত্রাকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও আজ কোটি টাকার বাঁধ প্রকল্পের আড়ালে সুপেয় পানি আর একটু স্থায়ী জীবিকার জন্য উপকূলের এই প্রান্তিক মানুষদের সংগ্রাম এখনো থামেনি।

এআইএল/সকালবেলা

মন্তব্য করুন