ঈদের তিন বেলার সহজ ও আরামদায়ক সাজগোজ
ফিচার ডেস্ক : ঈদের আনন্দকে পূর্ণতা দিতে সাজপোশাক ঘিরে সবারই মনে মনে কিছু না কিছু বিশেষ পরিকল্পনা থাকে। নতুন পোশাকের সঙ্গে ঠিক কেমন মেকআপ বা লুক তৈরি করলে তা নিখুঁত ও মানানসই হবে, তা নিয়ে উৎসবের বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই ভাবেন রূপ সচেতন নারীরা। তবে ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদের চেয়ে ঈদুল আজহা তথা কোরবানির ঈদের সার্বিক প্রস্তুতি ও পরিবেশ অনেকটাই ভিন্ন হয়ে থাকে। এই ঈদে সকাল থেকে শুরু করে প্রায় বিকেল পর্যন্ত কোরবানির মাংস কাটা, ধোয়া, সুনির্দিষ্ট ভাগে গোছানো, ফ্রিজে রাখা, চারপাশের মানুষের মাঝে বিলানো এবং ঘরে আসা অতিথিদের আপ্যায়নের কাজে একনাগাড়ে ব্যস্ত থাকতে হয়।
আবার গ্রামীণ বা শহুরে সব ধরনের যৌথ ও একক পরিবারেই নারীদের সাংসারিক নানা কঠিন কাজে সরাসরি হাত লাগাতে হয়। তার ওপর মে মাসের এই সময়টায় কখনো মাথার ওপর প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরম, আবার হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি—সব মিলিয়ে চড়া বা ভারী মেকআপ কিংবা অস্বস্তিকর কোনো পোশাক একদমই মানায় না। এই ঈদে মেকআপ আর পোশাক দুটোই হওয়া দরকার যথেষ্ট ঘরোয়া, হালকা এবং আরামদায়ক। গরম আর বৃষ্টির এই বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে ঈদে আপনার মেকআপ কেমন হওয়া উচিত—তা নিয়ে মূল্যবান ও দারুণ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন দেশের অন্যতম সেরা রূপচর্চা প্রতিষ্ঠান ‘জারা’স বিউটি লাউঞ্জ’-এর বিউটি কনসালট্যান্ট অ্যান্ড সিইও ফারহানা রুমি।
কোরবানির ঈদের দিন সকালে মাংস নিয়ে সবচেয়ে বেশি কর্মব্যস্ততা থাকে। তাই এই সময়ের সাজ হওয়া উচিত একদম মিনিমাল বা নামমাত্র এবং অবশ্যই ওয়াটারপ্রুফ বা পানি নিরোধক। মেকআপের প্রথম বা প্রধান স্টেপ হিসেবে ত্বকে একটু ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে। তারপর ত্বকের তৈলাক্ত ভাব দূর করতে একটি ভালো প্রাইমার দিন।
এই গরমে মেকআপকে সম্পূর্ণ সহজাত বা স্বাভাবিক রাখতে কোনো ধরনের ভারী ফাউন্ডেশনের বদলে একদম হালকা বিবি ক্রিম (BB Cream) বা টিন্টেড সানস্ক্রিন ব্যবহার করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এরপর এর ওপর হালকা একটু কমপ্যাক্ট পাউডার দিয়ে বেইজটা সেট করে নিতে পারেন। এতে এই চড়া গরমে ত্বকে ভারী কোনো লেয়ার তৈরি হবে না, বরং বেশ সহজাত একটা লুক আসবে। চোখের সাজে একদম হালকা ব্রাউন কোনো ট্রানজিশন শেড ব্যবহার করতে পারেন। সাথে ওয়াটারপ্রুফ কাজল ও মাশকারা ব্যবহার করলে চোখ জোড়ায় একটা সতেজ ভাব আসবে। ঠোঁটে একদম হালকা ন্যুড বা পিচ কালারের লিপস্টিক লাগালে মেকআপে স্নিগ্ধতা প্রকাশ পাবে। সব শেষে মেকআপ দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে একটা ভালো মানের সেটিং স্প্রে ব্যবহার করে নিন।
কোরবানির ঈদে মাংসের হরেক রকম পদ ও দুপুরের দীর্ঘ রান্না সারতে সারতে কিছুটা বিকেল গড়িয়ে যায়। বিকেল থেকেই মূলত শুরু হয় আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আসা-যাওয়া, বন্ধুদের সাথে প্রাণবন্ত আড্ডা কিংবা ফ্যামিলি গেট টুগেদার। তাই এই সময়ের সাজে চাই একটু উৎসবের ছোঁয়া, তবে তা যেন কোনোভাবেই অতিরিক্ত ভারী বা উগ্র না হয়। যেহেতু এখন বাইরে প্রচণ্ড গরম এবং যেকোনো সময় বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে, তাই বিকেলের মেকআপের ক্ষেত্রে ‘ডিউই বেইজ’-এর বদলে ‘ম্যাট বেইজ’ নির্বাচন করা ভালো।
সে ক্ষেত্রে ভালো মানের একটা লাইটওয়েট বিবি ক্রিম অথবা টিন্টেড ফাউন্ডেশন লাগিয়ে ত্বকে পাতলা একটি বেইজ তৈরি করতে পারেন। তারপর ভালো মানের কমপ্যাক্ট পাউডার দিয়ে সেট করে দিলেই পুরো বেইজটা খুব সুন্দর ও মসৃণভাবে বসে যাবে। মেকআপের উজ্জ্বলতা একটু বাড়াতে গালে হালকা ব্লাশন ও সফট হাইলাইটার ব্যবহার করতে পারেন। চোখের পাতায় ব্রাউন বা ব্রোঞ্জ আইলুক কিংবা হালকা সফট পিচ কালারের আইশ্যাডো ব্যবহার করতে পারেন। এতে চেহারায় একটা ফ্রেশ লুক তৈরি হবে। এখন চোখের কোণে হালকা কাজল কিংবা চিকন করে আইলাইনার টেনে নিলেই চোখের সাজ সম্পূর্ণ হবে। লিপস্টিকের ক্ষেত্রে সকালের মতোই হালকা কোনো ব্রাউন ন্যুড বা পিঙ্ক ন্যুড রঙ নির্বাচন করতে পারেন।
রাতের আনুষ্ঠানিক দাওয়াত, দূরের কোনো আত্মীয়ের বাড়ি ঘোরাঘুরি বা স্পেশাল ফ্যামিলি ফটোসেশনের জন্য রাতের সাজে অনায়াসেই নিয়ে আসতে পারেন একটু জমকালো ও গর্জিয়াস ভাব। মেকআপের ক্ষেত্রে রাতে ‘সফট গ্ল্যাম মেকআপ’ বেছে নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে মুখে মেকআপ শুরুর আগে অবশ্যই ভালো একটি পোর-মিনিমাইজিং প্রাইমার দিন। এরপর রাতের চড়া আলোয় ত্বকের সুরক্ষায় ভালো মানের সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে।
যেহেতু রাতে রোদ বা রান্নার গরমের ভয় থাকে না, তাই একটু নিখুঁত ও দীর্ঘস্থায়ী বেইজের জন্য একটি বিল্ডঅ্যাবল মিডিয়াম কাভারেজ ফাউন্ডেশন ব্যবহার করুন। অর্থাৎ সকাল বা দুপুরের লুকের চেয়ে রাতের বেইজটা সামান্য ভারী করতে হবে। প্রথাগত বা পুরোনো ডার্ক স্মোকি আইসের বদলে এখন ফ্যাশন দুনিয়ায় ‘শিমারি আইলুক’ বেশ ট্রেন্ডিংয়ে আছে। নিজের পরিহিত পোশাকের রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চোখে গ্লিটারি বা শিমারি আইশ্যাডো ব্যবহার করতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন, কালারগুলো যেন আই লিডে খুব সুন্দর করে ব্লেন্ড বা মিশে যায়।
এরপর চোখের সৌন্দর্য বাড়াতে চাইলে টানা করে ড্রামাটিক আইলাইনার কিংবা গাঢ় কাজল ব্যবহার করতে পারেন। চোখের পাপড়ি ঘন দেখাতে ভালো মাশকারা ব্যবহার করুন, এতে ল্যাশে একটা সুন্দর ভলিউম আসবে। মেকআপের ফিনিশিংয়ে কপাল, গাল ও নাকের দুপাশে এবং আইব্রো বোনে শাইনি হাইলাইটার দিন এবং হালকা ব্লাশন ব্যবহার করুন। এরপর পুরো মেকআপ দীর্ঘক্ষণ লক করে রাখতে ম্যাট সেটিং স্প্রে ব্যবহার করুন। রাতের চোখের সাজটা যদি একটু হালকা বা সোবার হয়, তবে ঠোঁটে একটু গাঢ় বা ডার্ক টোনের লিপস্টিক ব্যবহার করতে পারেন। আর চোখ গর্জিয়াস হলে ন্যুড টাইপের শেডগুলোই বেশি মানাবে। যেহেতু এখন লিপগ্লস খুব ট্রেন্ডে আছে, চাইলে ঠোঁটের মাঝে সামান্য একটু গ্লসও ছুঁইয়ে নিতে পারেন।
বিউটি এক্সপার্টরা পরিশেষে মনে করিয়ে দেন যে, উৎসবের দিনে শুধু ভালো মেকআপ বা দামি প্রসাধনী ব্যবহার করলেই হবে না; এর পাশাপাশি উৎসবের আগের দিনগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান, রাতের ঘুম এবং কাজের মাঝে নিজেকে মানসিক চাপমুক্ত রাখাটাই উৎসবের দিনে ত্বককে ভেতর থেকে দীপ্তিময় ও প্রাণবন্ত রাখার আসল রহস্য।
জান্নাত সকালাবেলা
|