নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীর মিরপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলা, নির্বিচারে গুলিবর্ষণ এবং লাঠিসোঁটা দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর জখমের ঘটনায় দায়ের করা একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাচেষ্টার মামলায় সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) সাবিনা আক্তার তুহিনকে সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২১ মে) মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার সুনির্দিষ্ট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানির পর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালত এই গ্রেপ্তারের আদেশ মঞ্জুর করেন।
এর আগে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিরপুর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. রাশেদুল ইসলাম জেলহাজতে থাকা আসামি সাবিনা আক্তার তুহিনকে কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন দাখিল করেন। আদালতে আজ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আসামিকে গ্রেপ্তার দেখানোর পক্ষে জোরালো আইনি শুনানি করেন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. খায়ের উদ্দিন শিকদার তুহিনের জামিন চেয়ে আদালতে আবেদন করেন। উভয় পক্ষের যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শেষে বিজ্ঞ আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে সাবেক এই এমপিকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দেন।
আদালতে পেশ করা মামলার এজাহার ও বিবরণী অনুযায়ী, গত বছর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সামনে এক স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও তাঁর শ্যালক একটি ভ্যানগাড়িতে করে সাধারণ মানুষের কাছে কাপড় বিক্রি করছিলেন। ঠিক ওই সময় তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগসহ এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সাধারণ ছাত্রদের ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে চারপাশ থেকে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে।
সশস্ত্র হামলার একপর্যায়ে রাবার বুলেটের আঘাতে ওই কাপড় ব্যবসায়ী গুরুতর আহত হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়লে সন্ত্রাসীরা তাকে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি মারপিট করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম করে। পরে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও আন্দোলনকারীরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে তাকে উদ্ধার করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান।
এই নৃশংস ঘটনার ঠিক কিছুক্ষণ পরেই একই এলাকায় ভ্যানগাড়ির কাপড় গোছানোর সময় ওই ব্যবসায়ীর শ্যালকের ওপরও দুষ্কৃতকারীরা নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে একটি তাজা গুলি তাঁর বাম পায়ে সরাসরি লাগলে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে যান। এর পাশাপাশি তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ছোঁড়া টিয়ারশেলের (কাঁদুনে গ্যাস) স্প্লিন্টারের আঘাতে তাঁর দুটি চোখই সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায় এবং তিনি চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারান। পরবর্তীতে তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতাল ও জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা দেওয়া হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে পেশ করা তাঁর আবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত এই পৈশাচিক ও নৃশংস হামলার ঘটনার পেছনে সাবেক সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলে, মামলার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন ও সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অন্য মামলায় ইতোমধ্যে জেলহাজতে থাকা এই প্রভাবশালী আসামিকে বর্তমান হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো অত্যন্ত জরুরি ছিল।
জান্নাত সকালাবেলা