তেহরানে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুরু, বিশ্বনেতাদের ব্যাপক উপস্থিতি

প্রকাশ: শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:৫৫ অপরাহ্ণ
তেহরানে সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুরু, বিশ্বনেতাদের ব্যাপক উপস্থিতি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক ঃ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আজ শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানী তেহরানে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। এই ঐতিহাসিক শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্স এবং এর চারপাশের রাজপথগুলোতে লাখ লাখ মানুষের ঢল নেমেছে, যা পুরো শহরকে এক শোকের সমুদ্রে পরিণত করেছে। ছয় দিনব্যাপী বিস্তৃত এই শোকানুষ্ঠান ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরের পাশাপাশি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকেও অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাকে চূড়ান্তভাবে দাফন করার কথা রয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আজ ভোররাত থেকেই তেহরানের রাস্তাগুলোতে মানুষের অবিরাম মিছিল শুরু হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে নজিরবিহীন বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং বহু এলাকায় সব ধরনের যান চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, মূল অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই বিশাল গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সের ভেতরের প্রধান চত্বরটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বহু মানুষ কয়েক কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান।

আজকের এই শোকানুষ্ঠানে উপস্থিত লাখো মানুষের পরনে ছিল কালো পোশাক। তাদের হাত ছিল ইরানের জাতীয় পতাকা এবং বিশেষ ‘লাল ব্যানার ও পতাকা’। উল্লেখ্য, ইরানি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে লাল পতাকাকে তীব্র ‘প্রতিশোধের প্রতীক’ হিসেবে গণ্য করা হয়। কফিনকে সামনে রেখে সমবেত ক্ষুব্ধ জনতা এ সময় ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগানে পুরো তেহরান মুখরিত করে তোলে। কাচঘেরা একটি বিশেষ সুরক্ষিত স্থাপনার ভেতরে আলী খামেনির কফিনটি রাখা হয়েছে। একই স্থানে ওই হামলায় নিহত তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের কফিনও শেষ শ্রদ্ধার জন্য রাখা হয়।

পরিবারের সদস্যদেরও স্মরণ

এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় শুধু সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকেই নয়, তাঁর সঙ্গে একই হামলায় নিহত পরিবারের সদস্যদেরও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ করা হচ্ছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন খামেনির এক জামাতা, জ্যেষ্ঠ কন্যা, মাত্র ১৪ মাস বয়সী এক নাতনি এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির স্ত্রী।

তবে নবনিযুক্ত সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নিজে আজ জনসমক্ষে এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত থাকবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট করা হয়নি। কারণ, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওই ভয়াবহ বিমান হামলায় তিনি নিজেও গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর চাউর হয়েছে। মোজতবা খামেনিকে পশ্চিমা গোয়েন্দারা পুনরায় টার্গেট করতে পারে—এমন হুমকির পর ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড এক যৌথ বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘যেকোনো ধরনের ভুল পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকার’ চরম হুঁশিয়ারি বার্তা দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের ব্যাপক উপস্থিতি

আলী খামেনির এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তেহরানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিদের এক অভূতপূর্ব সমাগম ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার বহু দেশ এই অনুষ্ঠানে তাদের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ইরাকের প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের স্পিকার, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির, আফগানিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং তুরস্কের ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্যক্তিগতভাবে তেহরানে উপস্থিত হয়েছেন। এছাড়াও উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সৌদি আরবের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী, কাতারের শুরা কাউন্সিলের স্পিকার, ওমানের স্টেট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এবং মিসরের সিনেট স্পিকার অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিশেষ দূত হিসেবে দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ তেহরানে এসে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। চীনের জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির উপসভাপতির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল এই শেষ বিদায়ে অংশ নিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন বলে ইরানি গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও), ওআইসি এবং ডি-৮ এর প্রতিনিধিরা তেহরানে উপস্থিত আছেন। এর পাশাপাশি লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের ইসলামিক জিহাদ এবং ইয়েমেনের হুথিসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতারা খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে যোগ দিয়েছেন।

ট্রাম্পের বক্তব্যে নতুন বিতর্ক ও তেহরানের জবাব

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খামেনির এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া চলাকালীন এক বিতর্কিত মন্তব্য করে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস (৪ জুলাই) উপলক্ষে মাউন্ট রাশমোরে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান এখন চরম কোণঠাসা এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো শর্তে সমঝোতায় পৌঁছাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলেন, “আমরা ভেনেজুয়েলাকে এক দিনেই পরাস্ত করেছি এবং ইরানকেও এবার অত্যন্ত কঠোর আঘাত করেছি। তারা এখন আমাদের সাথে সমঝোতা করতে ছটফট করছে। আমরা মূলত ভালো মানুষ বলেই তাদের সর্বোচ্চ নেতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য এক সপ্তাহের একটা মানবিক সময় দিয়েছি।” ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সাথে কোনো শান্তি চুক্তি হলে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, ভুট্টা ও সয়াবিন আমদানি করতে হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দাম্ভিক মন্তব্যের তীব্র ও কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান পরমাণু negotiator মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি ট্রাম্পকে ধুয়ে দিয়ে লেখেন, “যে দেশের নিজেরই চার কোটিরও বেশি নাগরিক প্রতিদিন বেঁচে থাকার জন্য সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির (স্ন্যাপ) ওপর নির্ভরশীল, সেই দেশের দেউলিয়া নেতার মুখে অন্য একটি স্বাধীন জাতিকে ক্ষুধার্ত বলা আসলে নিজের ভেতরের চরম সংকটেরই বহিঃপ্রকাশ।” গালিবাফ স্পষ্ট করে বলেন, “ইরানের সম্পদ এবং সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ইরানিদের নিজস্ব। ট্রাম্পের উচিত অন্যের চিন্তা না করে আমেরিকার নিজস্ব অপুষ্টির হার ও দারিদ্র্য নিয়ে মাথা ঘামানো।”

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আল জাজিরার মূল্যায়ন অনুযায়ী, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির এই আকস্মিক বিদায় কেবল একজন দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিশম্যাটিক নেতার অবসান নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি নতুন ও চরম অনিশ্চিত অধ্যায়ের সূচনা। খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের এই বিশাল শোকাচ্ছন্ন জনসমুদ্র এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তেহরানে জমায়েত আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ এবং আঞ্চলিক যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ভূমিকা পালন করবে।

মন্তব্য করুন