আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেল ৪টা ২২ মিনিটে অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত ‘জাতীয়’ ও ‘স্বাস্থ্য নীতি, জাতীয় বাজেট ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র কাঠামো’ বিভাগের বিশেষ যৌথ বুলেটিংয়ে চিকিৎসা খাতের এই নতুন সরকারি মহাপরিকল্পনার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলো।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক’ (UAP)-এর ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বাজেট সংলাপ: অগ্রাধিকার, ঘাটতি ও করণীয়’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব যুগান্তকারী নীতিমালার কথা ঘোষণা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (BoT) কনফারেন্স রুমে এই বিশেষ সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর দেশের রুগ্ন স্বাস্থ্য খাতের ক্ষতগুলো তুলে ধরে বলেন, “বিগত দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যেভাবে পুরোপুরি লন্ডভন্ড ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে, সেখান থেকে একটি আধুনিক ও সুসংহত জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরি করতে বর্তমান অন্তর্বর্তী বা নির্বাচিত সরকার শতভাগ বদ্ধপরিকর। এই বিশাল লক্ষ্য পূরণে আমরা পর্যায়ক্রমে ও ধারাবাহিকভাবে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) ৫ শতাংশ অর্থ সরাসরি স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের জাতীয় বাজেটে বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এক অভাবনীয় আমূল পরিবর্তনের জন্য বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক প্রস্তাব গ্রহণ করা হচ্ছে।”
তৃণমূলের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, “গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় সার্বক্ষণিকভাবে যাতে লাইসেন্সধারী দক্ষ ডাক্তার ও সেবিকা উপস্থিত থাকেন, প্রথমে আমরা সেই আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করব। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবকাঠামো ও সেবার মানে বড় রকমের গুণগত পরিবর্তন আনা হবে। উপজেলা পর্যায়ে এমনভাবে সংস্কার করা হবে, যেখানে একদিকে যেমন সাধারণ শয্যার (Bed) পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হবে, অন্যদিকে তার চেয়েও বেশি জোর দেওয়া হবে সেবার বৈচিত্র্যের ওপর। এখন থেকে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালেই যেন নবজাতক ও শিশুদের জন্য শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ, নারীদের প্রসূতি সেবার জন্য গাইনোকোলজিস্ট এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের জন্য আধুনিক ফিজিওথেরাপির বিশেষায়িত চিকিৎসক নিশ্চিত থাকে, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”
পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও দেশীয় স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই শীর্ষ উপদেষ্টা বলেন, “বর্তমান যুগে মানুষের ‘ডিজিজ বার্ডেন’ বা রোগের ধরন পুরোপুরি চেঞ্জ হয়ে গেছে। আগে যেখানে কলেরা বা টাইফয়েডের মতো সংক্রামক রোগের প্রকোপ বেশি ছিল, এখন সেখানে মানুষের ভুল জীবনযাত্রার কারণে ‘লাইফস্টাইল ডিজিজ’ (যেমন: হৃদরোগ, কিডনি বিকল, ডায়াবেটিস ও ক্যানসার) আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এই কঠিন বাস্তবতা মাথায় রেখে দেশের প্রতিটি জেলা শহরের সরকারি হাসপাতালে অত্যাধুনিক করোনারি কেয়ার ইউনিট (CCU), আইসিইউ এবং সুলভ মূল্যের কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটের মতো আধুনিক লাইফ-সাপোর্ট ব্যবস্থা চালু করার জন্য সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।”
ড. তিতুমীর দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট নেতৃত্বাধীন এই সরকার মূলত বাংলাদেশকে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে চায়। আর একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শর্তই হলো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে পৌঁছে দেওয়া এবং একটি সার্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা (Universal Health Coverage) তৈরি করা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে খুব দ্রুত হাজার হাজার নতুন ডাক্তার, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী ও নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে।”
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, অতীতে কোনো সরকারই এ দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য বা ঠিক করেনি। ফলে সাধারণ মানুষের ‘আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার’ (চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিজের পকেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়) দিন দিন জ্যামিতিক হারে বেড়ে গেছে। সঠিক চিকিৎসার অভাবে এ দেশের মানুষকে জমিজমা বিক্রি করে বিদেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়েছে এবং শয্যা সংকট ও ওষুধের কৃত্রিম সংকটে সাধারণ পরিবারগুলোকে চরম হিমশিম খেতে হচ্ছে। আগামী বাজেটের আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা এই সব সংকটের স্থায়ী সমাধান টানব।”
ইউএপি-র বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের খ্যাতনামা অধ্যাপক ড. নাজমা বেগমের অত্যন্ত চমৎকার ও প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় এবং স্কুল অব বিজনেসের ডিন অধ্যাপক ড. এম. এ. বাকী খলিলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ড. রুমানা হক। এ ছাড়া সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ দেন ইউএপি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সম্মানিত চেয়ারম্যান কে. এম. মুজিবুল হক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া। সংলাপে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক এবং চিকিৎসা খাতের নীতি-নির্ধারকেরা অংশ নেন।
জান্নাত সকালবেলা