নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক জেলের কাছে মে দিবস এখনও তেমন পরিচিত নয়। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন সমুদ্রে ছুটে চলা এসব শ্রমজীবী মানুষ অধিকাংশ সময়ই ব্যস্ত থাকেন মাছ ধরার কাজে। ফলে দিবসটির ইতিহাস ও তাৎপর্য সম্পর্কে তাদের মধ্যে সচেতনতা খুবই কম। উপকূলীয় উপজেলা পাথরঘাটার পশ্চিমে সুন্দরবন সংলগ্ন বলেশ্বর নদী, পূর্বে বিষখালী নদী এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ মৎস্য পেশার ওপর নির্ভরশীল, যাদের বলা হয় জেলে শ্রমিক। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে প্রতিনিয়ত জীবিকা নির্বাহ করলেও তারা এখনও প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি পাননি।
জেলেদের ভাষায়, তাদের কোনো দিবস নেই, তারা শুধু কাজ করে খান। জীবন বাজি রেখে যারা প্রতিনিয়ত সমুদ্রে মাছ শিকার করেন, এমন কয়েকজন জেলের সাথে কথা বলে জানা যায় তাদের দীর্ঘ আক্ষেপের কথা। জেলে ফারুক হোসেন জানান, দাদন নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যান তারা। মাছ পেলে ১৬ ভাগের ৮ ভাগ মালিকের এবং বাকি ৮ ভাগ ১৮ জন জেলের মধ্যে ভাগ হয়। বাজার খরচের পর লাভ থাকলে টাকা পান, নয়তো শূন্য হাতে ফিরতে হয়। ৪২ বছর ধরে সাগরে কাজ করা বৃদ্ধ আবদুর জব্বার বলেন, ঝড়ে-জলোচ্ছ্বাসে কতবার বিপদে পড়েছেন তার হিসাব নেই। তবুও পেটের দায়ে এই বয়সেও তাকে সমুদ্রে যেতে হয়।
পাথরঘাটার ছগির হোসেন, আলতাফ মিয়া ও ইসমাইলসহ অধিকাংশ মানুষই মৎস্য পেশার ওপর নির্ভরশীল। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) মৎস্য খাতের অবদান প্রায় ৩.৫০ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও মৎস্য শ্রমিকরা এখনও অবহেলিত। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) গবেষক এস. এম. জাকির হোসেন বলেন, উপকূলের জেলেরা জলদস্যু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে ২৪ ঘণ্টা কাজ করলেও তাদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা শ্রমিকের স্বীকৃতি নেই। গবেষক শফিকুল ইসলাম খোকন জানান, মৎস্য খাতে জাল বোনা, ট্রলার মেরামত ও বরফ উৎপাদনসহ নানা কাজে হাজারো শ্রমিক জড়িত থাকলেও তাদের বিষয়ে নীতিগত উদ্যোগ কম।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত ৭ বছরে বৈরি আবহাওয়ায় বরিশাল বিভাগে ২৫৯ জন জেলের মৃত্যু হয়েছে। বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা আরও বেশি। এছাড়া এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৩ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১৮৮ জন জেলে নিখোঁজ রয়েছেন। এত প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক অবদান থাকা সত্ত্বেও উপকূলের এই বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ভাগ্যে জোটেনি শ্রমিকের মর্যাদা।
আই.এ/সকালবেলা