হাওর অঞ্চলের বোরো ধান উৎপাদন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: একটি সমন্বিত বিশ্লেষণ

আমিরুল ইসলাম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৩৯ অপরাহ্ণ
হাওর অঞ্চলের বোরো ধান উৎপাদন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: একটি সমন্বিত বিশ্লেষণ
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
হাওর অঞ্চল বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিবেচিত হয়ে আসছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিস্তৃত এই অঞ্চলটি মূলত বোরো ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে বছরে মাত্র একটি ফসল উৎপাদিত হয়। ফলে এই একমাত্র ফসলই কৃষকের জীবিকা, স্থানীয় অর্থনীতি এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশের মোট বোরো ধান উৎপাদনের প্রায় ১৫–২০ শতাংশ হাওর অঞ্চল থেকে আসে এবং দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫–৬০ শতাংশ বোরো মৌসুমে উৎপাদিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে হাওর অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব আরও সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হাওর অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমে এই অঞ্চল সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে যায় এবং শুধুমাত্র শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজ পরিচালনা করা সম্ভব হয়। ফলে সময় ব্যবস্থাপনা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধান রোপণ, পরিচর্যা এবং বিশেষ করে কর্তন, মাড়াই ও শুকানো কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হয়।
প্রতি বছর আগাম বন্যা, পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা কৃষকের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে পাকা বা আধাপাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতির সৃষ্টি করে।
হাওর অঞ্চলে প্রায় ৯.৫ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয় এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা সাধারণত ৩৫–৩৮ লাখ টনের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়। এই উৎপাদন জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
বাংলাদেশে বোরো ধান চাষের জন্য হাওরাঞ্চল একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অঞ্চল। বিশেষ করে সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ এবং ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলায় ব্যাপকভাবে বোরো ধান চাষ হয়। উল্লেখযোগ্য হাওরগুলোর মধ্যে রয়েছে হাকালুকি হাওর (দেশের বৃহত্তম), টাঙ্গুয়ার হাওর (আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি), দেকার হাওর, শনি হাওর, কড়চার হাওর, গুঙ্গিয়াজুরি হাওর, কাউয়াদিঘি হাওর এবং কাদিরপুর হাওর।
হাওর অঞ্চলে বোরো ধান কাটার প্রধান সময় সাধারণত ১৪ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত হলেও বাস্তবে ২০–২৫ এপ্রিলের মধ্যেই অধিকাংশ ধান কাটার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কারণ এই সময়ের পর আগাম বন্যার ঝুঁকি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এপ্রিলের ২৫ তারিখের মধ্যে ৭০–৯০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ এবং তা অনেকাংশে অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কম্বাইন হারভেস্টার এনে দ্রুত ধান কাটার ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
তবে চলতি বছর পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্নধর্মী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এ বছরও কম্বাইন হারভেস্টার সচল রাখা, অন্যান্য এলাকা থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্র নিয়ে আসা এবং মাঠ পর্যায়ে সমন্বয় ও মনিটরিং জোরদারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তারপরও প্রতিকূল আবহাওয়া, টানা বৃষ্টি এবং কিছু এলাকায় অকাল পানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ধান কাটার অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। ২৮ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী হাওর অঞ্চলে ধান কাটার অগ্রগতি গড়ে মাত্র ৪০–৫২ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। সুনামগঞ্জে অর্ধেকের কম ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে, যদিও কিছু এলাকায় প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে। কিশোরগঞ্জে প্রায় ৪৮ শতাংশ এবং নেত্রকোনায় প্রায় ৫২ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। এই ধীরগতির ফলে আগাম বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একই সময়ে টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং কিছু এলাকায় শিলাবৃষ্টির কারণে হাওর অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক ফসল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলার হাওরসমূহে প্রায় ৫,০০০ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সুনামগঞ্জ জেলার দেকার ও কড়চার হাওরসহ বিভিন্ন এলাকায় অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির ফলে ধানের গাছ পচে যাওয়া এবং উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেত্রকোনার মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী উপজেলার নিম্নাঞ্চলে ধান তলিয়ে গেছে, বিশেষ করে কাদিরপুর হাওর এলাকায় ঝুঁকি বেশি। কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা, নিকলী ও মিঠামইন উপজেলার হাওরসমূহেও পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে হাকালুকি হাওরেও টানা বৃষ্টির কারণে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
এই ক্ষয়ক্ষতির প্রধান কারণ হিসেবে আগাম বন্যা, পাহাড়ি ঢল, টানা বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি চিহ্নিত হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহ এবং স্থানীয় ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে অল্প সময়ের মধ্যে হাওরের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। অনেক ক্ষেত্রে জমিতে পানি জমে থাকায় কম্বাইন হারভেস্টার প্রবেশ করতে পারে না, ফলে সময়মতো ধান কাটা সম্ভব হয় না এবং ক্ষতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ধান কাটার কার্যক্রমে একাধিক কাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা একসাথে কাজ করছে। একদিকে কম্বাইন হারভেস্টারের স্বল্পতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যন্ত্রের অপ্রতুলতা মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে, অন্যদিকে জ্বালানি—বিশেষ করে ডিজেলের—পর্যাপ্ত সরবরাহের কিছুটা ঘাটতি কৃষি যন্ত্র পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে সময়মতো ধান কাটা সম্ভব না হওয়ায় কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং জাতীয় উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং পূর্বপ্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। প্রতিটি হাওরের জন্য পৃথক মনিটরিং সেল গঠন, উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু করা এবং মাঠ পর্যায়ে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসাথে কম্বাইন হারভেস্টারের সংখ্যা বৃদ্ধি, কার্যকর “মেশিন ব্যাংক” গঠন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত যন্ত্র মোতায়েনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। হাওর অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আলাদা ডিজেল রিজার্ভ ও মোবাইল ফুয়েল স্টেশন স্থাপন করা যেতে পারে।
স্বল্পমেয়াদি ও আগাম ফলনশীল ধানের জাত সম্প্রসারণ, রোপণের সময় কিছুটা এগিয়ে আনা এবং কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য কার্যকর দ্রুত সতর্কবার্তা (early warning system) চালু করা গেলে তারা সময়মতো ফসল কাটার প্রস্তুতি নিতে পারবে।
দীর্ঘমেয়াদে হাওর অঞ্চলের কৃষির জন্য একটি পৃথক জাতীয় নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যেখানে কৃষি বীমা, আধুনিক যান্ত্রিকীকরণ, গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং জলবায়ু অভিযোজন কৌশল অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ড্রোন, IoT এবং GIS-ভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসল পর্যবেক্ষণ উন্নত করা গেলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও দ্রুত, নির্ভুল ও কার্যকর হবে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, হাওর অঞ্চলের বোরো ধান দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলেও এটি একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কৃষি ব্যবস্থা। সময়মতো ধান কাটা, পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি, উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এই ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তাই একটি কার্যকর, সমন্বিত এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
লেখক: প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক
এলএসটিডি প্রকল্প, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), গাজীপুর

মন্তব্য করুন