শিশুকে চুবিয়ে হত্যা: ‘ক্রাইম পেট্রোলে’ আসক্ত কিশোরী গ্রেফতার
কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি: গাজীপুরের কালীগঞ্জে মায়ের অতিরিক্ত আদর থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ ও ঈর্ষা থেকে বাড়ির ভাড়াটিয়ার আড়াই বছরের এক শিশুকে গোসলখানার বালতির পানিতে চুবিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর বিরুদ্ধে। পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে সে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে। পুলিশ জানায়, সে ভারতীয় অপরাধভিত্তিক টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘ক্রাইম পেট্রোল’-এ তীব্রভাবে আসক্ত ছিল।
আজ রবিবার (২১ জুন) দুপুরে অভিযুক্ত কিশোরীকে গাজীপুর আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাকে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে (হাজতবাসে) পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ ঘটনায় নিহত শিশুর বাবা আজ সকালে কালীগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
এর আগে, গতকাল শনিবার (২০ জুন) বিকেলে কালীগঞ্জ পৌরসভার দেওপাড়া এলাকায় এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে। নিহত শিশু আরিশা আক্তার জান্নাত রাজবাড়ী জেলার রামকান্তপুর এলাকার আলহাজ শেখ ও গোলাপী বেগমের মেয়ে। আলহাজ শেখ চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে দেওপাড়া এলাকার আবুল কালামের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন এবং স্থানীয় সেভেন রিংস সিমেন্ট কারখানায় কর্মরত। অভিযুক্ত কিশোরী ওই বাড়ির মালিকের মেয়ে এবং স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়া— এই দুই পরিবারের মধ্যে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। বাড়ির মালিকের স্ত্রী (অভিযুক্ত কিশোরীর মা) ছোট্ট আরিশাকে ভীষণ পছন্দ করতেন এবং নিজের সন্তানের মতোই বেশি আদর করতেন। গতকাল বিকেলে বাড়ির উঠানে আরিশার সাথে খেলছিল ওই কিশোরী। এ সময় দুই পরিবারের বড়রা ঘরের ভেতরে কথা বলছিলেন।
কিছুক্ষণ পর আরিশাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে পরিবারের লোকজন খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে গোসলখানায় ঢুকে একটি প্লাস্টিকের বালতির পানিতে শিশুটিকে উপুড় ও ডুবন্ত অবস্থায় দেখতে পান তার বাবা-মা। তাঁদের ডাক-চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আরিশাকে উদ্ধার করে দ্রুত কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আরিশাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর অভিযুক্ত কিশোরী নিজেও হাসপাতালে গিয়ে আরিশার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। শিশুটির মৃত্যুর খবর জানার পরপরই সে সরাসরি কালীগঞ্জ থানায় গিয়ে দায়িত্বরত পুলিশকে বলে, "আমি আরিশাকে বালতির পানিতে চুবিয়ে হত্যা করেছি।" এরপর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তাকে হেফাজতে নিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে।
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, কিশোরীর মা মৃত আরিশাকে অতিরিক্ত স্নেহ করতেন, যা নিজের মেয়ে হয়েও অভিযুক্ত কিশোরী মেনে নিতে পারেনি। মায়ের ভালোবাসা ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ার এই মানসিক হতাশা থেকে তার মনে শিশুটির প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও ঈর্ষার সৃষ্টি হয়। এছাড়া সে দীর্ঘদিন ধরে ‘ক্রাইম পেট্রোল’-এর মতো অপরাধমূলক টিভি সিরিয়াল নিয়মিত দেখত, যা তাকে এই অপরাধের কৌশল সাজাতে প্ররোচিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে কিশোরী মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ বলেও জানা গেছে।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকির হোসেন এবং পরিদর্শক (তদন্ত) আশরাফুল ইসলাম জানান, "অভিযুক্ত কিশোরীর নিজস্ব স্বীকারোক্তি ও পারিপার্শ্বিক আলামতে সে-ই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে এই নিষ্ঠুর খুনের পেছনে অন্য কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণ বা কারও ইন্ধন আছে কিনা, তা আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।"
এআইএল/সকালবেলা
|