বগুড়ায় ধর্ষণ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
ওয়াফিক শিপলু (বগুড়া প্রতিনিধি): বগুড়ার ধুনটে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করার প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগী এক বিধবা নারীর মেডিকেল পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। মেডিকেল পরীক্ষা করানোর কথা বলে ওই নারীর কাছ থেকে চার হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী। এদিকে মামলা তুলে নিতে রাজি না হওয়ায় আসামি ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে তিন কন্যাসন্তানসহ ওই নারীকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে বসতঘরে তালা লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এসব ঘটনায় ধুনট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওসমান গনির বিরুদ্ধে প্রতিকার চেয়ে শনিবার (৩১ অক্টোবর) বগুড়ার পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী নারী।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন কন্যাসন্তান নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করছিলেন ওই নারী। এ সময় তার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে প্রতিবেশী ও সম্পর্কে মামাশ্বশুর রেজাউল করিম তাকে বিভিন্ন সময় কুপ্রস্তাব দিতেন। এতে রাজি না হওয়ায় গত ২১ আগস্ট রাতে ওই নারীর ঘরে ঢুকে গলায় ছুরি ধরে তাকে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় পরদিন ২২ আগস্ট ধুনট থানায় অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী নারী। তবে থানা থেকে প্রতিকার না পেয়ে ২৭ আগস্ট বগুড়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলা করেন তিনি। যার মামলা নম্বর ১৬৩।
আদালত মামলাটি এজাহার হিসেবে রেকর্ড করে আসামির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশ দেন। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর মামলাটি রেকর্ড করে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় এসআই ওসমান গনিকে।
ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, মামলা তুলে নিতে আসামি রেজাউল করিম ও তার স্বজনেরা বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে আসছেন। এতে রাজি না হওয়ায় তাকে তিন কন্যাসন্তানসহ বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এমনকি তার শয়নকক্ষে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি তিনি। বর্তমানে তিন সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন ওই নারী।
ওই নারীর আরও অভিযোগ, ধর্ষণের ঘটনায় মেডিকেল পরীক্ষা করানোর কথা বলে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ওসমান গনিকে চার হাজার টাকা দিয়েছেন তিনি। কিন্তু ঘটনার প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও তার মেডিকেল পরীক্ষা কিংবা প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়নি। এতে ধর্ষণের আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি। এ ছাড়া আসামির কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা তাকে গ্রেপ্তার করছেন না বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে ধুনট থানায় গিয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ওসমান গনিকে পাওয়া যায়নি। পরে তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ৩০ মিনিটের মধ্যে থানায় আসার কথা জানান। তবে তার বক্তব্যের জন্য এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পরে আবার ফোন করা হলে ওসমান গনি বলেন, ভুক্তভোগী নারী ডাক্তারি পরীক্ষায় রাজি হননি। তবে এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরিতে কোনো নোট করা হয়েছে কি না কিংবা ভুক্তভোগীর কাছ থেকে লিখিত কোনো বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। একপর্যায়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে ধুনট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম কথা বলতে রাজি হননি। একপর্যায়ে তিনি জানান, মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। আলামত যেকোনো সময় পরীক্ষা করা যেতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) হোসাইন মুহাম্মদ রায়হান বলেন, যখন কোনো ধর্ষণ মামলা রুজু হয়, তখন আমরা দ্রুত ভুক্তভোগীর মেডিকেল পরীক্ষা করিয়ে থাকি। তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এখানে জানা যাচ্ছে, প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তার নমুনা সংগ্রহ বা মেডিকেল পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে আমি কথা বলেছি। কথা বলে জানতে পেরেছি, ভুক্তভোগী নিজেই মেডিকেল পরীক্ষা করাতে চাননি। তবে এ সংক্রান্ত কোনো আইনগত ব্যত্যয় হয়েছে কি না, তা অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা তদন্ত করে দেখব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের অবহেলা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বগুড়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোজাম্মেল হক বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী নির্যাতন, বিশেষ করে ধর্ষণের মতো অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। তিন বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। এ ধরনের বহু ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
মোজাম্মেল হক বলেন, এ ক্ষেত্রে আদালত একটি মামলা থানায় এজাহার হিসেবে রেকর্ড করার নির্দেশ দিয়েছেন। যথারীতি থানায় মামলাটি এজাহার হিসেবে রেকর্ডও হয়েছে। কিন্তু এরপর প্রায় দুই মাস হয়ে গেলো। এত দিনে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, ধর্ষণের মতো অপরাধের ঘটনায় দ্রুত মেডিকেল পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। দ্রুত পরীক্ষা করা না হলে গুরুত্বপূর্ণ আলামত, বিশেষ করে শুক্রাণু নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই তদন্ত কর্মকর্তার উচিত ছিল দ্রুত ভুক্তভোগীর মেডিকেল পরীক্ষা করানো এবং প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা।
তিনি আরও বলেন, সত্যিই যদি দুই মাস পরও ভুক্তভোগীর মেডিকেল পরীক্ষা না হয়ে থাকে, তাহলে এটি তদন্তে অবহেলার শামিল। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা যেতে পারে। শুধু তাই নয়, আলামত ধ্বংসের বিষয়টি প্রমাণিত হলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে শাস্তির বিধান রয়েছে। যদি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সত্যিই এমনটি করে থাকেন, তাহলে তা গুরুতর অন্যায় এবং আইনের ব্যত্যয়। তার উচিত ছিল দ্রুত মেডিকেল পরীক্ষা করানো, আলামত জব্দ করা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়া। তা না করে তিনি আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করেছেন বলেও আমি মনে করি।
এআইএল/সকালবেলা