ছয় মাসে ৯ প্রাণহানি: ঢাকা–গোপালগঞ্জ রুটে দোলা পরিবহনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
হেলাল মুন্সী ,বিশেষ প্রতিবেদক : ঢাকা–গোপালগঞ্জ রুটে যাত্রী পরিবহনে অন্যতম বহুল ব্যবহৃত মাধ্যম ‘দোলা পরিবহন’। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বাস একের পর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় জড়িয়ে পড়ায় এর সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, চালকদের দক্ষতা, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং যানবাহনের যান্ত্রিক সক্ষমতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
সর্বশেষ আজ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) কাশিয়ানীর শিবগাতী এলাকায় দোলা পরিবহনের একটি বেপরোয়া বাসের সঙ্গে একটি প্রাইভেটকারের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই দুইজন নিহত এবং আরও বেশ কয়েকজন যাত্রী গুরুতর আহত হন। সংঘর্ষের তীব্রতায় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের খাদে গিয়ে পড়ে।
তবে গত ছয় মাসের প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং গোপালগঞ্জ অঞ্চলে এই পরিবহনের সঙ্গে জড়িত দুর্ঘটনার এটি একটি দীর্ঘ সিকোয়েন্স বা ধারাবাহিকতা। গত ছয় মাসের মধ্যে এই রুটে দোলা পরিবহনের অন্তত পাঁচটি বড় দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে, যেগুলোতে প্রাণ হারিয়েছেন মোট ৯ জন মানুষ।
গত ছয় মাসে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য দুর্ঘটনাগুলোর চিত্র:
২৮ মে: গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বেদগ্রাম এলাকায় দোলা পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মর্মান্তিকভাবে ৫ জন নিহত হন। ওই দুর্ঘটনায় অন্তত ২০ জনযাত্রী ও পথচারী আহত হওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
১ জুন: প্রথম বড় দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার গোপীনাথপুর এলাকায় দোলা পরিবহনের একটি দ্রুতগামী বাসের ধাক্কায় এক ব্যাটারিচালিত রিকশাভ্যানচালক নিহত হন।
১০ সেপ্টেম্বর: টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতী-মধুমতী সেতুর টোল প্লাজার বুথে দোলা পরিবহনের একটি বাস সজোরে ধাক্কা দেয়। ওই সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাসটির মারাত্মক ব্রেক জনিত সমস্যার কথা উঠে আসে।
১৯ সেপ্টেম্বর: কাশিয়ানীর পোনা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দোলা পরিবহনের বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বাসটির অতিরিক্ত গতিই ছিল এই মৃত্যুর প্রধান কারণ।
২৩ সেপ্টেম্বর (সর্বশেষ): কাশিয়ানীর শিবগাতীতে বাস ও প্রাইভেটকারের সংঘর্ষে নতুন করে আরও দুইজনের মৃত্যু হলো।
একের পর এক এমন প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা–গোপালগঞ্জ রুটে নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীদের প্রধান প্রশ্ন হলো—বাসের চালকদের গতি নিয়ন্ত্রণ ও মহাসড়কে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ রয়েছে কি না। পাশাপাশি যানবাহনের ফিটনেস এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ যথাযথভাবে করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও জোরালো প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রতিটি ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে ঠিক কী ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা নিয়েও জনমনে ধোঁয়াশা রয়েছে।
দোলা পরিবহনের নিজস্ব অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে নিরাপদ যাত্রার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানটি অতীতে অতিরিক্ত গতিকে দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে চালকদের জন্য নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ ও ওরিয়েন্টেশনের কথা জানিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে চলা এই ধারাবাহিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাগুলো নিয়ে দোলা পরিবহন কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট বা বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
পরিশেষে ভুক্তভোগী ও সাধারণ যাত্রীদের একটাই আকুতি—একই রুটে বারবার কেন ঝরবে তাজা প্রাণ? যাত্রীদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দোলা পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ও কঠোর কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।