প্রেমের ফাঁদে ফেলে অর্থ ও স্বর্ণালংকার আত্মসাৎ: সাবেক শিক্ষিকা আমেনার বিচার শুরু

প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৮ পূর্বাহ্ণ
প্রেমের ফাঁদে ফেলে অর্থ ও স্বর্ণালংকার আত্মসাৎ: সাবেক শিক্ষিকা আমেনার বিচার শুরু
আমেনা আক্তার
বিশেষ প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম :  পর্দাশীল ও ধার্মিক নারীর ছদ্মবেশ, প্রেমের নাটক এবং বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দেনমোহর ও অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নেওয়াই যাঁদের মূল পেশা। দীর্ঘ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক দুর্ধর্ষ প্রতারক চক্রের রূপ, যার কেন্দ্রে রয়েছেন চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার পাশে 
মোহাম্মদ নগর ৭ নম্বর রোডে অবস্থিত তিতুমীর স্কুলের সাবেক শিক্ষিকা ও তাঁর পরিবার। ভুয়া পরিচয়ে একাধিক বিয়ে, ব্ল্যাকমেইল, কিশোর গ্যাং দিয়ে হুমকি এবং দেশীয় মদের অবৈধ ব্যবসার মতো গুরুতর সব অভিযোগের পর অবশেষে আইনি জালে আটকা পড়েছেন এই চক্রের কুখ্যাত মূল নায়িকা আমেনা আক্তার।

গত ১৬ই সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম)-২ আদালত শুনানি শেষে অভিযুক্ত প্রতারক আমেনা আক্তারের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০ (প্রতারণা) ধারায় আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জ (অভিযোগ) গঠন করেছেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর মামলাটির বিচারকাজ এইবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো। 

অনুসন্ধান ও সিআর মামলার (নং-৩৩৭/২৪, বায়েজিদ থানা) নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, বায়েজিদ থানাধীন মোহাম্মদ নগর ৭ নম্বর রোডে অবস্থিত তিতুমীর স্কুলের সাবেক শিক্ষকা আমেনা আক্তার প্রথম পরিচয়ে নিজেকে অত্যন্ত বিনয়ী, পর্দাশীল ও ধার্মিক হিসেবে তুলে ধরেন। এরপর শিকারের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে বিয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে আস্থা অর্জন করেন। 

গত বেশ কয়েক বছরে এই নারী সুকৌশলে অন্তত ১৩ থেকে ১৪ জন যুবকের সাথে প্রেমের ছলনা করে অর্থ মূল্যবান সামগ্রী ও স্বর্ণ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে ভুক্তভোগীরা জানান। এদের মধ্যে কুমিল্লার আদনান রাকিব, সাদ্দাম, সোহাগ, মাহমুদ, হানিফ এবং কুয়াইশ এলাকার ইলেকট্রিক সরঞ্জাম ব্যবসায়ী মোর্শেদ ও রাসেল, বায়েজিদ এলাকার অনলাইন জুয়াড়ি ও অবৈধ ডলার ব্যবসায়ী রনি সহ অনেকের সাথেই তিনি
কখনো প্রেম ও ভালোবাসার নাটক করে ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের আবাসিক হোটেলে যাতায়াত ও অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। 

স্থানীয় পাশ্ববর্তী বাসিন্দা ও ঘনিষ্ঠ স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, আমেনার অতীতে বহু বিয়ে ও ডিভোর্সের ন্যাক্কারজনক ঘটনা রয়েছে: 

প্রথম বিয়ে: ভুক্তভোগী হানিফ নামের এক যুবককে বিয়ে করার পর, পরে মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা-পয়সা আদায় করে তাকে ডিভোর্স দেন। 

দ্বিতীয় বিয়ে ও সটকে পড়া: পরবর্তীতে গাড়ি ব্যবসায়ী মাসুদ নামের এক ব্যক্তির সাথে বিয়ে হলেও মাত্র ৮ দিনের মাথায় সংসার ছেড়ে বায়েজিদ এলাকার অনলাইন জুয়াড়ি ও অবৈধ ডলার লেনদেনকারী রনি নামের এক বিবাহিত ব্যক্তির সাথে পালিয়ে যান প্রতারক আমেনা। এরপর মাসুদের কাছ থেকে লাখ টাকার দেনমোহর আদায়ের জন্য মামলার হুমকি দিতে শুরু করেন  প্রতারক  আমেনা  আক্তার ও তাঁর পরিবার।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, আমেনা আক্তারের পুরো পরিবারটি একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ সিন্ডিকেটের মতো কাজ করে। আমেনার বাবা সেলিম মূলত নগরীর একটি ডেভেলপার কোম্পানির  সামান্য পিক্যাপ ড্রাইভার হলেও, আমেনা  প্রতারণার মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষের কাছে তার বাবাকে ‘বড় গাড়ি ব্যবসায়ী’ পরিচয় দিয়ে নিজের সামাজিক উঁচু অবস্থান  তুলে ধরার মিথ্যা চেষ্টা করতেন।  আমেনার  পিতা সেলিম ড্রাইভার ও তাঁর স্ত্রী রুমা বেগম রাতে নিজেদের বাসার ছাদ ও কক্ষে নিয়মিত দেশীয় চোলাই মদের আসর বসান। সেখানে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধী ও আসামিদের যাতায়াত থাকে
তাদের বাসায়।

অন্যদিকে, ভুক্তভোগীরা যাতে টাকা ফেরত চাইতে বা মুখ খুলতে না পারেন, সে জন্য আমেনার ছোট ভাই বাদশার নেতৃত্বাধীন স্থানীয় ‘কিশোর গ্যাং’ ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ব্ল্যাকমেইল করে থাকে। 

সাংবাদিকের দায়ের করা মামলা ও বিচার প্রক্রিয়া
আমেনা আক্তারের এই ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চলের দায়িত্ব প্রাপ্ত একটি স্বনামধন্য
জাতীয় দৈনিক পত্রিকার ব্যুরো প্রধান। 

মামলার বিবরণীতে ভুক্তভোগী সাংবাদিক  জানান, বিয়ে করার কথা বলে আমেনা তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। পরে গভীর বিশ্বাস তৈরি করে পারিবারিক সংকটের কথা জানিয়ে আমেনা ও তাঁর মা রুমা বেগম যৌথভাবে তাঁর কাছ থেকে নগদ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ৩ ভরি স্বর্ণালঙ্কার হাতিয়ে নেন। প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি গত ২৭ মে ২০২৪ইং তারিখে চট্টগ্রাম আদালতে আমেনা আক্তার ও তাঁর মা রুমা বেগমকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। যা পরবর্তীতে আদালত তদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেট্রো পিবিআই কে দায়িত্ব দেন। 
চট্টগ্রাম মেট্রো পিবিআই দীর্ঘ সময় ধরে গভীর ভাবে তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পাওয়ায়
আমেনা আক্তারকে আসামি করে ফৌজদারী পেনাল কোডের ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় আদালতে রিপোর্ট দাখিল করেন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে চট্টগ্রাম সিএমএম-২ আদালত আসামি আমেনা আক্তারের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় অভিযোগ গঠন করে বিচার প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ প্রদান করেন। 

উত্তাপিত এসব বিস্ফোরক অভিযোগ ও আদালতের চার্জ গঠনের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত আমেনা আক্তারের মা রুমা বেগম এবং বাবা সেলিম ড্রাইভারের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি।

মন্তব্য করুন