আওয়ামী লীগের জন্য মায়াকান্না, অথচ নিজ দলের নেত্রীর জন্য কাঁদেনি হৃদয় !
অন্য নেতার জন্য দরদ, অথচ খালেদা জিয়ার ভাঙা নামফলক পুনঃস্থাপনে উদাসীন নিজস্ব নেতারাই!
কিশোরগঞ্জের যশোদলে
মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের নামে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাথমিক
বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ
বিভিন্ন স্তরে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক
‘নাম পরিবর্তন’ সংস্কৃতির বিপরীতে বিএনপির নেতা-কর্মীদের এই অবস্থানকে অনেকে ‘রাজনৈতিক
উদারতা’ ও ‘ন্যায্য’ বলে অভিহিত করছেন। তবে এই উদারতার সমান্তরালে বিএনপির অভ্যন্তরেই
এখন এক বড় আত্মজিজ্ঞাসা ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
দলের তৃণমূল ও
ত্যাগী কর্মীদের একাংশের প্রশ্ন— অন্য দলের নেতাদের সম্মান রক্ষায় যে দরদ দেখানো হচ্ছে,
নিজ দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আত্মমর্যাদা
রক্ষায় সেই একই তৎপরতা কোথায়?
বিগত আওয়ামী লীগ
সরকারের আমলে দেশের বিভিন্ন স্থানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার
নামাঙ্কিত অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হয়। এমনকি বিএনপি আমলে নির্মিত নতুন
স্টেডিয়াম এবং নার্সিং ইনস্টিটিউটে বেগম খালেদা জিয়ার নিজ হাতে উন্মোচন করা উদ্বোধনী
ফলকগুলোও ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল তৎকালীন সরকারি দলের ক্যাডাররা।
ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের
অভিযোগ, তৎকালীন সময়ে সেই চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেভাবে জোরালো প্রতিবাদ হওয়া উচিত
ছিল, তা দেখা যায়নি। অথচ বেগম জিয়াকে ‘মা’ ডেকে রাজনীতিতে সুবিধা নেওয়া নেতার অভাব
কোনোকালেই ছিল না। মায়ের সম্মানহানির পর তথাকথিত সেই 'সন্তানদের' নীরবতা আজ বড় প্রশ্ন
চিহ্নের মুখে পড়েছে।
সবচেয়ে বড় বিস্ময়
ও ক্ষোভের জায়গা তৈরি হয়েছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকার
ক্ষমতায় আসারও তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখনো ভেঙে পড়ে থাকা সেই দুটি
ঐতিহাসিক প্রস্তর ফলক সামান্য কিছু অর্থ ব্যয় করে পুনঃস্থাপন করার মতো কোনো কার্যকর
উদ্যোগ স্থানীয় কোনো নেতার চোখে পড়েনি।
তৃণমূলের কর্মীরা
আক্ষেপ করে একটি গণমাধ্যমকে বলেন, "নির্বাচন এলে, নতুন কমিটি গঠন কিংবা প্রটোকলের
দাপট দেখানোর সময় নেতার অভাব হয় না। গ্রুপিং ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট
করতে সবাই পটু। কিন্তু নেত্রীর স্মৃতি ও সম্মান রক্ষায় পকেট থেকে সামান্য কিছু টাকা
খরচ করে দুটি ফলক নতুন করে লাগানোর মতো নিঃস্বার্থ কর্মী বা নেতা কি আজ বিএনপিতে একজনও
নেই?"
বিএনপির এই উদাসীনতার
বিপরীতে অন্য দলের নেতা-কর্মীদের ত্যাগ ও অনড় অবস্থানের দুটি ঐতিহাসিক উদাহরণ এখন রাজনৈতিক
মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
প্রথমত, ২০১৬
সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কিশোরগঞ্জ টেক্সটাইল মিলসে এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা একটি ঐতিহাসিক
উদ্বোধনী ফলক অপসারণ করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা
সেদিন তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ফলশ্রুতিতে সেই কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয় এবং তিনি
ক্ষমা চেয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন।
দ্বিতীয়ত, ২০০৮
সালে কিশোরগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম আশরাফ উদ্দিন
কলেজের গুদামঘর থেকে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর একটি ভাঙা ফলকের আটটি টুকরো উদ্ধার করেন।
পরম যত্নে সেই টুকরোগুলো জোড়া দিয়ে তিনি ফলকটি আবার যথাস্থানে স্থাপন করেছিলেন।
প্রসঙ্গত প্রতিপক্ষের
প্রতি উদারতা দেখানো দোষের কিছু নয়, কিন্তু তা যেন নিজের ঘরের অভিভাবকের প্রতি চরম
অবহেলা আর উদাসীনতার ঢাকনা হয়ে না দাঁড়ায়— এটাই এখন নীতি নির্ধারকদের প্রতি সাধারণ
কর্মীদের প্রচ্ছন্ন বার্তা।
|