মোংলার জেলে মিরাজ শেখ গুমের শিকার, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গভীর উদ্বেগ
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাগেরহাটের মোংলা অঞ্চল থেকে প্রকাশ্য দিবালোকে কোস্ট গার্ড সদস্য পরিচয়ে মিরাজ শেখ (৩০) নামের এক সাধারণ জেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার দীর্ঘ প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও ওই যুবকের কোনো সন্ধান বা হদিস পায়নি তার অসহায় পরিবার।
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে এটিই ‘জোরপূর্বক গুমের প্রথম ঘটনা’ উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
গতকাল রবিবার (১৯ জুলাই) নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত এক বিশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এইচআরডব্লিউ অবিলম্বে নিখোঁজ মিরাজ শেখকে অক্ষত অবস্থায় খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে গুমের সংস্কৃতি বন্ধ ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
নিখোঁজ মিরাজ শেখের বাড়ি সুন্দরবনসংলগ্ন মোংলা উপজেলার জয়মণি গ্রামে। তিনি পেশায় একজন সাধারণ জেলে হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
মিরাজের পরিবার ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সুনির্দিষ্ট দাবি, তাকে সর্বশেষ রাষ্ট্রীয় বাহিনী কোস্ট গার্ডের সরাসরি হেফাজতে দেখা গেছে। মিরাজের স্ত্রী মুক্তা খানম জানান, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টার দিকে স্থানীয়দের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন তার স্বামীকে কোস্ট গার্ড আটক করেছে। মুক্তা বলেন, ‘খবর পেয়ে আমি মোংলার দিগরাজে কোস্ট গার্ডের মূল পন্টুনে গিয়ে দেখি আমার স্বামীকে আটকে রাখা হয়েছে। সেখানে কোস্ট গার্ডের পোশাকে ৮ থেকে ১০ জন এবং সাদা পোশাকে ৬-৭ জন জোয়ান ছিলেন। তাকে একটি বিশেষ কক্ষে ঢুকিয়ে জেরা করা হয় এবং প্রায় ৩০ মিনিট পর স্পিডবোটে করে গভীর সুন্দরবনের হাড়বাড়িয়া ক্যাম্পের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, পরদিন সকালে তারা মোংলার দিগরাজে কোস্ট গার্ড কার্যালয়ে খোঁজ নিতে গেলে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা প্রথমে বলেন যে মিরাজকে নিয়ে একটি বিশেষ অভিযান চলছে এবং তাদের বিকেলে আসতে বলা হয়। তবে পরিবারের সদস্যরা বিকেলে পুনরায় সেখানে গেলে কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ উল্টো সুর ধরে জানানো হয়, মিরাজ নামে কোনো ব্যক্তি তাদের কাছে কখনোই ছিল না।
এদিকে যে চায়ের দোকান থেকে মিরাজকে আটক করা হয়েছিল, সেই স্থানীয় দোকানের মালিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন, গত ২১ এপ্রিল কোস্ট গার্ড সদস্য পরিচয়ে এক ব্যক্তি এসে মিরাজের ফেলে যাওয়া মোটরসাইকেলের তালা খুলে চাবি দিয়ে নিয়ে যান এবং ঠিক তার পরদিন সেটি আবার চায়ের দোকানে ফেরত দিয়ে যান।
এই রহস্যজনক ঘটনার পর গত ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং পরবর্তীতে ৮ মে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে মিরাজের সন্ধান দাবি করে তার পরিবার। দেশের স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো ধরণের প্রতিকার না পেয়ে মিরাজের বাবা নিরুপায় হয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করেন।
উক্ত রিটের দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ১২ জুলাই মহামান্য হাইকোর্ট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে নিখোঁজ মিরাজ শেখকে যেকোনো মূল্যে খুঁজে বের করে সশরীরে আদালতে হাজির করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেন। এইচআরডব্লিউ আদালতের এই ঐতিহাসিক ও মানবিক আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
তবে ঘটনার শুরু থেকেই জেলে মিরাজ শেখকে আটকের সব ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবি করে তা অস্বীকার করে আসছে কোস্ট গার্ড কর্তৃপক্ষ। কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন এবং অপারেশনস অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শামসুল আরেফিন সংবাদমাধ্যমকে জানান, মিরাজকে আটকের বিষয়ে তাদের অপারেশনাল নথিতে কোনো তথ্য বা রেকর্ড নেই।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে হাজারো নিরীহ মানুষ জোরপূর্বক গুমের নির্মম শিকার হয়েছেন। পট পরিবর্তনের পর সর্বশেষ এই ঘটনাটি স্পষ্ট দেখিয়ে দিচ্ছে যে, দেশের নিরাপত্তা খাতের প্রকৃত ও আমূল সংস্কার না হলে এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। কারণ নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে এই বিচারহীনতার চর্চা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।’
সংস্থাটি তাদের বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করে, ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়া বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুমের ঘটনার স্বাধীন তদন্ত ও যেকোনো গোপন আটককেন্দ্র পরিদর্শনের বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে একটি জরুরি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু সম্প্রতি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নেওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচিত সরকার সেই ঐতিহাসিক অধ্যাদেশটি নবায়ন না করে নতুন একটি আইনের খসড়া প্রস্তাব করেছে। সরকারের প্রস্তাবিত নতুন আইনে গুমের তদন্তভার পুনরায় বিতর্কিত পুলিশের হাতেই রাখা এবং মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা সংকুচিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশে গুমের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার স্বাধীন প্রক্রিয়াকে চরমভাবে দুর্বল ও বাধাগ্রস্ত করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে এইচআরডব্লিউ।
|