আইসিইউতে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উচ্চ ঝুঁকি: সংক্রমণ প্রতিরোধ জোরদারের তাগিদ
বিশেষ সংবাদদাতা: দেশের হাসপাতালগুলোর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) আশঙ্কাজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে চিকিৎসায় নিরাময়যোগ্য নয় এমন মারাত্মক ওষুধ-প্রতিরোধী (ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট) ব্যাকটেরিয়া। আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম’ এবং ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল’-এ প্রকাশিত আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) সাম্প্রতিক দুটি গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউতে ভর্তির সময় যেসব রোগী এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ামুক্ত ছিলেন, তাঁদের অর্ধেকেরও বেশি চিকিৎসাধীন অবস্থায় এগুলো দ্বারা সংক্রমিত হয়েছেন। তবে আশার কথা হলো, সঠিক ও কঠোর সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এ সংক্রান্ত মৃত্যু ও মারাত্মক ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-র অর্থায়নে ঢাকার একটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ ও নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) ভর্তি হওয়া প্রায় সাত শতাধিক রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় মূলত ‘ডিফিকাল্ট-টু-ট্রিট রেজিস্ট্যান্ট গ্রাম-নেগেটিভ’ ব্যাকটেরিয়ার ওপর আলোকপাত করা হয়েছে, যা প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং রোগীদের মধ্যে নিউমোনিয়া, রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ, মূত্রনালীর সংক্রমণ ও ক্ষত সৃষ্টির মতো জটিলতা তৈরি করে।
আইসিডিডিআর,বি-র সহকারী বিজ্ঞানী এবং গবেষণার প্রধান লেখক ড. গাজী মো. সালাহউদ্দীন মামুন জানান, “ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে আমরা দেখেছি কীভাবে হাসপাতালে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ছড়ায় এবং রোগীর শরীরে নীরব বা সুপ্ত অবস্থায় থাকা ব্যাকটেরিয়া পরবর্তীতে প্রাণঘাতী সংক্রমণে রূপ নেয়।”
গবেষণায় দেখা যায়, আইসিইউর প্রায় ৪৮.৫ শতাংশ রোগীর অন্ত্রে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ছিল। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শুরুতে সম্পূর্ণ ব্যাকটেরিয়ামুক্ত থাকা ১৯৮ জন রোগীর মধ্যে ১০৫ জনই (৫৩ শতাংশ) আইসিইউতে অবস্থানকালে সংক্রমিত হয়েছেন। আর যাদের কালচার পরীক্ষায় সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে আইসিইউতে মৃত্যুহার ছিল ৯০ শতাংশেরও বেশি।
এ সংক্রান্ত গবেষণার প্রধান গবেষক ড. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, “রোগীরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে অন্য কোনো প্রাণঘাতী সংক্রমণে আক্রান্ত হবেন—এমনটা কাম্য নয়। রোগীদের সুরক্ষায় সংক্রমণ প্রতিরোধ, পরিচ্ছন্নতা এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিকল্প নেই।”
তবে দ্বিতীয় গবেষণায় দেখা গেছে, যথাযথ সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে কমানো সম্ভব। ঢাকার একটি এনআইসিইউতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করার পর দেখা গেছে—প্রতি ১০০ জন রোগীর ক্ষেত্রে রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ ২৮ থেকে কমে মাত্র ৪ জনে এবং মৃত্যুহার ২৬ থেকে কমে ৪ জনে নেমে এসেছে।
আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, “এই গবেষণা একদিকে যেমন আমাদের স্বাস্থ্য খাতের বড় চ্যালেঞ্জ ফুটিয়ে তুলেছে, অন্যদিকে প্রমাণ করেছে যে সঠিক পদক্ষেপ নিলে সংক্রমণ ও মৃত্যু বহুগুণ কমানো সম্ভব। নীতি-নির্ধারক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উচিত পরিচ্ছন্নতা ও দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারকে প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবেলা ও সংকটাপন্ন রোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত নজরদারি, হাত ধোয়ার অভ্যাস ও পরিবেশগত জীবাণুমুক্তকরণ জোরদার করাই এখন অন্যতম কার্যকর কৌশল।
এআইএল/সকালবেলা
|