হুইপ বকুলের কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা, যুবদল নেতা সুমন আটক
সরদার সাইদী হাসান বাবু, খুলনা ব্যুরো প্রধান: জাতীয় সংসদের হুইপ ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম বকুলের কণ্ঠস্বর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে নকল করে সাড়ে ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। এই প্রতারণার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে যুবদল নেতা সুমনকে আটক করেছে খুলনা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
২৬ সেপ্টেম্বর ভোরে পটুয়াখালী থেকে তাকে আটক করা হয়। পরে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন তথ্য বেরিয়ে আসে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে আত্মসাৎ করা অর্থের একটি বড় অংশ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মামলার বাদী খুলনার ব্যবসায়ী জিএম আজিজুর রহমান। এজাহার সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ও খুলনা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আরিফ প্রথমে বাদীর সাথে যোগাযোগ করে জানান যে, হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল তার সাথে কথা বলতে চান।
পরবর্তীতে একটি বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে গ্রুপ কলে এক ব্যক্তি নিজেকে হুইপ বকুল পরিচয় দিয়ে কথা বলেন। তিনি পুরোনো যন্ত্রপাতি কেনার জন্য অগ্রিম টাকা দাবি করেন। বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার শিকার হয়ে বাদী ২৯ জুলাই ২০২৬ বিকেলে খুলনা সদর থানাধীন স্যার ইকবাল রোডের ‘আলফি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল’ কার্যালয়ে প্রথম দফায় ২ কোটি টাকা এবং ২ আগস্ট আরও ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রদান করেন। সব মিলিয়ে সাড়ে ৩ কোটি টাকা হস্তান্তর করা হয় অভিযুক্তদের।
টাকা দেওয়ার পর থেকে অভিযুক্তরা বিভিন্ন অজুহাত দেখাতে শুরু করেন। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে হুইপ বকুল খুলনায় এলে বাদী সরাসরি তার সাথে দেখা করেন। এসময় বকুল জানান, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং এর সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
এরপর বিষয়টি প্রতারণা হিসেবে নিশ্চিত হয়ে বাদী খুলনা সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এজাহারে ১ নম্বর আসামি হিসেবে এজাজ আহম্মেদ রাজা, ২ নম্বর আসামি হিসেবে শেখ মাহাবুবুর রহমান মামুন এবং আরও ৫-৬ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে বলা হয়েছে, পারস্পরিক যোগসাজশে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও এআই ব্যবহার করে হুইপ বকুলের কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে তার পরিচয়ে কথা বলা হয় এবং সাইবার স্পেস ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে খুলনা মহানগরীর ৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি ইমরান ও তার গাড়িচালক বাবুকেও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
খুলনা মহানগর ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, “এ ঘটনায় আর কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে প্রাথমিক তদন্তে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।”
এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার নাম ও এআই দিয়ে কণ্ঠ নকল করে সাড়ে তিন কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনাটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও গুরুতর অপরাধ। যারা আমার রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুণ্ন করার জন্য এ ধরনের জঘন্য প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, অপরাধী যেই হোক, সে ছাত্রদল হোক আর যুবদল হোক, যত বড় নেতাই হোক, কোনোভাবেই ক্ষমা করা হবে না। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার শাস্তি আরও কঠোর হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ইতিমধ্যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
এই ঘটনাটি দেশে সাইবার নিরাপত্তা এবং এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এআইএল/সকালবেলা