রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৪ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণের উদ্যোগে ১৭ দলের তীব্র প্রতিবাদ

প্রকাশ: সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৬ অপরাহ্ণ
রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৪ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণের উদ্যোগে ১৭ দলের তীব্র প্রতিবাদ
রাজধানীর পুরানা পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কার্যালয়ে ১৭ দলের যৌথ সভা।

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ৪৪টি লাভজনক ও কৌশলগত রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশি-বিদেশি বেসরকারি করপোরেট বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত বা ইজারা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগের তীব্র প্রতিবাদ ও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে দেশের ১৭টি বাম, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। দলগুলোর শীর্ষ নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জনগণের রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেসরকারি করপোরেট পুঁজির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে দেওয়ার এই আত্মঘাতী উদ্যোগ জাতীয় স্বার্থ, দেশীয় শিল্পায়ন এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের জন্য এক বড় ধরণের দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আজ সোমবার (২০ জুলাই) রাজধানীর পুরানা পল্টনে অবস্থিত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ১৭টি দলের এক বিশেষ যৌথ নীতি নির্ধারণী সভা থেকে এই যৌথ উদ্বেগ ও প্রতিবাদ প্রকাশ করা হয়।

সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এক বিশেষ প্রস্তাবে, রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি বড় সরকারি করপোরেশনের আওতাধীন ৪৪টি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগের নামে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে ‘সম্পূর্ণ গণবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়। একই সাথে এই গণবিরোধী সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিলের জোর দাবি জানানো হয়।

যৌথ সভায় বাম ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতারা বলেন, ‘পুনঃবিনিয়োগ’, ‘পুনর্গঠন’, ‘দীর্ঘমেয়াদি ইজারা’, ‘যৌথ উদ্যোগ’ (জেভি) এবং ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’-এর মতো চটকদার ও বিভিন্ন আইনি কাঠামোর ধূম্রজাল তৈরি করে মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো সুকৌশলে বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের চেষ্টা চালাচ্ছে প্রশাসন। তাঁদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, সরকার এটিকে দেশের শিল্পখাতে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যাপক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির একটি আধুনিক কর্মসূচি হিসেবে সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করলেও, বাস্তবে এটি বিগত দীর্ঘদিনের পুঁজিপতিবান্ধব উদারীকরণ ও বেসরকারিকরণ নীতির একটি বিপজ্জনক ধারাবাহিকতা মাত্র।

১৭ দলের গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাবে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, পরিকল্পিত অব্যবস্থাপনা, সীমাহীন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, আধুনিক প্রযুক্তির চরম অভাব, সময়মতো প্রয়োজনীয় সরকারি বিনিয়োগ না করা এবং দক্ষ পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করার কারণেই সুপরিকল্পিতভাবে বহু ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে বছরের পর বছর ধরে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। এখন সেই লোকসানকে ঢাল ও অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় গড়া বিপুল সম্পদ বেসরকারি করপোরেট মালিকানায় নামমাত্র মূল্যে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

প্রস্তাবে নেতারা আরো উল্লেখ করেন, সরকার দেশের ঐতিহ্যবাহী ১৩টি চিনিকলসহ মোট ৪৪টি বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার আকস্মিক ঘোষণা দিলেও, ঠিক কোন মানদণ্ড বা যোগ্যতার ভিত্তিতে এসব জাতীয় প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য কত, কী কী কঠিন শর্তে ইজারা বা যৌথ বিনিয়োগের চুক্তি হবে এবং চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রের মালিকানা কতটুকু বজায় থাকবে—এসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জাতীয় বিষয়ে জনগণের সামনে কোনো স্বচ্ছ বা আনুষ্ঠানিক তথ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। দেশের জাতীয় সম্পদ নিয়ে এমন মহাগুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত দেশের সাধারণ জনগণ, কলকারখানার শ্রমিক, অর্থনীতিবিদ, শিল্প বিশেষজ্ঞ এবং সর্বোপরি জাতীয় সংসদের সাথে কোনো ধরণের পূর্ব আলোচনা বা সংলাপ ছাড়াই সম্পূর্ণ একতরফাভাবে নেওয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক।

উচ্চপর্যায়ের এই যৌথ সভা থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের চলমান সব প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করা, প্রস্তাবিত ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, তাদের সঠিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন ও সম্ভাব্য চুক্তির সব শর্তাবলি শ্বেতপত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করার দাবি জানানো হয়। একই সাথে দেশের নিবন্ধিত শ্রমিক সংগঠন, প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে একটি ‘জাতীয় সংলাপ’ আয়োজন করার আহ্বান জানান নেতারা। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা চিনিকল, পাটকলসহ সব রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সরকারি অর্থায়নেই আধুনিকায়নের মাধ্যমে পুনরায় পুরোদমে চালুর দাবি তোলা হয়।

একই সাথে দেশের জাতীয় সম্পদ, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পখাত এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে দেশের সর্বস্তরের মেহনতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে রাজপথে একটি শক্তিশালী ও যুগপৎ গণআন্দোলন গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয় সভা থেকে।

এ ছাড়া, রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ধ চিনিকলগুলো দ্রুত আধুনিকায়ন করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পুনরায় চালুর দাবিতে ‘চিনিকল রক্ষা সংগ্রাম জাতীয় কমিটি’ ঘোষিত আগামী ১০ আগস্ট ঢাকায় কেন্দ্রীয় সমাবেশ কর্মসূচির প্রতি ১৭ দলের পক্ষ থেকে পূর্ণ ও আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সমর্থন ঘোষণা করা হয়।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় দেশের প্রগতিশীল রাজনীতির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফি রতন, জাতীয় গণফ্রন্টের প্রধান সমন্বয়ক টিপু বিশ্বাস, বাংলাদেশের জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন, আনোয়ার হোসেন বাবু, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার ও মোশারফ হোসেন নান্নু, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সমন্বয়ক ফয়জুল হাকিম লালা, বাসদ (মাহবুব) সাধারণ সম্পাদক হারুনার রশীদ ভূইয়া ও মহিনউদ্দিন চৌধুরী লিটন, নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার সভাপতি জাফর হোসেন, বাসদ (মার্কসবাদী) নেতা ডা. জয়দ্বীপ ভট্টাচার্য, সাম্যবাদী আন্দোলনের নেতা মনজুর আলম মিঠু, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চের আহ্বায়ক মাসুদ খান, গণমুক্তি ইউনিয়নের আহ্বায়ক নাসিরউদ্দিন আহমেদ নাসু, সোশ্যালিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, সোনার বাংলা পার্টির সভাপতি সৈয়দ হারুন অর রশীদ, সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী।

এছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল রক্ষা সংগ্রাম জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে সভায় বক্তব্য ও নীতি নির্ধারণে অংশ নেন কমিটির আহ্বায়ক কামরুজ্জামান ফিরোজ, কাইউম হোসেন, মানস নন্দী, শামীম ইমাম, আ.ক.ম জহিরুল ইসলাম, শহীদুল ইসলাম সবুজ ও সুশান্ত সিনহা সুমন প্রমুখ।

মন্তব্য করুন